
স্টাফ রিপোর্টার : চাঁদপুরের কৃতী সন্তান ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছরের ছেলে ইশায়েক শাহরিয়ার অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২০ ঘণ্টা পর শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়সংলগ্ন একটি নির্জন স্থান থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তুহিন, আনাস ও ফাহিম নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম।
পুলিশ জানায়, শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তুহিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকায় অপ্রতীমের সঙ্গে তুহিনকে দেখা গেছে। সেখানে তারা প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান করেছিল। এরপর সন্ধ্যা ৭টার দিকে আনাস এবং এর প্রায় আধা ঘণ্টা পর সাড়ে ৭টার দিকে ফাহিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওসি মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম বলেন, ‘সন্দেহভাজন তুহিন, আনাস ও ফাহিমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে।’
অপ্রতীম বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার একজন ব্যবসায়ী। অপ্রতীম তাদের একমাত্র সন্তান। মরদেহ উদ্ধারের সময় তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে এবং কীভাবে সে লালমাই পাহাড়সংলগ্ন ওই নির্জন স্থানে পৌঁছাল—তা নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে।
নিখোঁজের পর উদ্বিগ্ন পরিবার : পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় অপ্রতীম। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তার সঙ্গে একটি আইফোন ছিল। এরপর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা ও রাত হলেও সে বাসায় ফিরে আসেনি।
ছেলের কোনো সন্ধান না পেয়ে উদ্বিগ্ন পরিবারের পক্ষ থেকে শুক্রবার রাতেই কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। পরে পুলিশ ও পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁজতে বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালান।
অবশেষে শনিবার দুপুরে বিজয়পুর সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়সংলগ্ন জঙ্গলের একটি নির্জন স্থান থেকে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
‘আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে?’ : ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে ভেঙে পড়েন তার মা ড. নাহিদা বেগম। সন্তানের মরদেহ উদ্ধারের পর বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে? আমাকে জবাব দেন। আমি এই কুমিল্লায় চাকরি করতে এসেছি, এটা কি আমার অন্যায়? আমার ছেলেকে কেন হত্যা করা হলো? আমি এর জবাব চাই। আমি এখন কীভাবে বাঁচব?’
সন্তানের মৃত্যুতে শোকে ভেঙে পড়া নাহিদা বেগম বলেন, ‘আমি কোনো বিচার চাই না, আমাকে এর উত্তর দিতে হবে। আমার ছোট্ট একটা ছেলে, সে কী অন্যায় করেছে? তার কী অন্যায় ছিল? আমি শুধু জানতে চাই। এটা কোন দেশ?’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার তো একটাই ছেলে। আমি কেমনে আমার জীবন কাটাব? আমি আমার জীবন পার করব কেমনে? আমারে একটু সবাই বলেন, আমি আমার জীবনটা পার করব কেমনে।’
মাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে কাঁদলেন এমপি : অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে তার বাসায় যান স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। এ সময় সন্তানের মৃত্যুতে বাবা-মায়ের কান্না ও আহাজারিতে সেখানে হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
মা নাহিদা বেগমের আহাজারি শুনে এমপি মনিরুল হক চৌধুরীও কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘এর কোনো জবাব আমার কাছে নেই মা।’
পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি এ এলাকার এমপি হিসেবে লজ্জিত ও দুঃখিত। এক মাসুম বাচ্চাকে রক্ষা করতে পারলাম না। আমি প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব। ৯০ দিনের মধ্যে এ ঘটনার বিচার শেষ করতে হবে।’
তদন্তে পুলিশ, চলছে অভিযান : কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম বলেন, দক্ষিণ মোড়ের দক্ষিণ পাশের জঙ্গল থেকে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে এবং আমরা কিছু ক্লু পেয়েছি।
আমাদের কাছে একজন আছে, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। আমি এখান থেকে যাওয়ার পর বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখব, তদন্ত করব। প্রকৃত হত্যাকারী না ধরা পর্যন্ত আমরা ননস্টপ এটা নিয়ে কাজ করব।’ পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতীমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে।




