ফরিদগঞ্জ বালিথুবায় বায়না করে জমি না পেয়ে ভোগান্তিতে গ্রহীতা

ফরিদগঞ্জ প্রতিনিধি : চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার বালিথুবা পূর্ব ইউনিয়নের শোশাইরচর গ্রামের মৃত নুর মোহাম্মদ খানের ছেলে মো. মিজানুর রহমান তাঁর নিজস্ব ০.১৩২৫ শতাংশ সম্পত্তি এবং ওই সম্পত্তির ওপর নির্মিত দুটি ভবন বিক্রির উদ্দেশ্যে একই ইউনিয়নের বালিথুবা গ্রামের আবু সাঈদের ছেলে শরীফুল ইসলামের সঙ্গে বায়নাপত্র চুক্তিনামা সম্পাদন করেন।

চুক্তি সম্পাদনের প্রায় এক বছর পার হলেও তিনি এখন পর্যন্ত ওই সম্পত্তি সাবকবলা দলিলমূলে হস্তান্তর করেননি। দীর্ঘদিন ধরে টালবাহানা করায় শরীফুল ইসলাম চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্পত্তি ও দুটি ভবনসহ বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয় এক কোটি পঁচানব্বই লাখ টাকা। বায়নাপত্র সম্পাদনের সময় জমির মালিক দুই লাখ টাকা গ্রহণ করেন।

বাকি টাকা পরিশোধ এবং জমির মালিকের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের পর এক মাসের মধ্যে দলিল সম্পাদন করে দেওয়ার কথা বায়নাপত্রে উল্লেখ করা হয়। বায়নাপত্রে এ ধরনের শর্ত উল্লেখ থাকলেও খোঁজ নিয়ে, জমি ও ভবন বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিজানুর রহমানের নামে থাকা সম্পত্তি এমআর কে ট্রেডার্সের নামে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবিএল), চাঁদপুর শাখায় বন্ধক রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যাংক তাঁর বিরুদ্ধে চেক ডিজঅনার মামলা করে। ওই সময় ব্যাংক ব্যবস্থাপকের পরামর্শে পাশের গ্রামের শরীফুল ইসলামের সঙ্গে নির্ধারিত মূল্যে ব্যাংক ব্যবস্থাপকের কক্ষে আনোয়ার হোসেন ও শাহজাহান তপাদারের উপস্থিতিতে বায়নাপত্র সম্পাদন করা হয়। বাজারের ব্যবসায়ী সেন্টু জানান, শরীফুল ইসলাম প্রথমে এই জায়গা কিনতে চাননি। তাঁরা কয়েকজন মিলে তাঁকে রাজি করিয়েছিলেন।

কিন্তু মিজানুর রহমান বায়নাপত্রের এক মাস পার হওয়ার পর বারবার সময় বাড়িয়ে কালক্ষেপণ করেন। শরীফ জমি সাবকবলা করার জন্য ব্যাংকে বারবার যোগাযোগ করেন। শেষ পর্যন্ত শরীফকে জমি লিখে দেওয়া হয়নি। এ ঘটনার পর দুই বাজারে সালিশি বৈঠক হলে সেখানে তিনি উপস্থিত ছিলেন। এরপর তাঁকে আর কিছু জানানো হয়নি। বায়নাপত্রের সাক্ষী আনোয়ার হোসেন জানান, ব্যাংক ব্যবস্থাপকের কক্ষে যখন বায়নাপত্র সম্পাদন হয়, তখন ব্যবস্থাপককে সাক্ষী হওয়ার জন্য বলা হলেও স্বাক্ষরের সময় তিনি সরে পড়েন।

পরে তিনি জানান, এক মাসের মধ্যে ব্যাংক থেকে কিছু সুদ মওকুফ করে মিজানুর রহমানকে ঋণ পরিশোধের সুযোগ করে দেবেন। তখন শরীফ পুরো টাকা ব্যাংকে জমা দিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করে নেবেন। ব্যবস্থাপকের আশ্বাসে শরীফ একটি ব্যাংকে জমির মূল্য পরিমাণ টাকা জমা রাখেন। পরে ব্যবস্থাপকের পরামর্শে ইউসিবিএলের ঢাকার একটি শাখায় জমির মূল্য পরিমাণ টাকা জমা করে তাঁকে অবহিত করেন। ব্যাংকে টাকা জমা হওয়ার পর থেকে মিজানুর রহমান ও ব্যাংক ব্যবস্থাপক নানা অজুহাতে ঋণের সঙ্গে টাকা সমন্বয় না করে টালবাহানা করে আসছেন। পাটওয়ারী বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর ঢালী জানান, জমির বায়না থেকেই তিনি সবকিছু জানেন। জুলাই মাসে মিজানুর রহমান তাঁকে সঙ্গে করে ঢাকায় নিয়ে যান শরীফুল ইসলামের কাছে। তখন তিনি ঋণ সমন্বয় করে আগস্টে জমি লিখে দেওয়ার কথা বলেন।

কিন্তু এরপর তিনি তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেননি। বায়নাপত্রের আরেক সাক্ষী শাহজাহান তপাদার বলেন, প্রথমে তিনি বিষয়টি জানতেন না। পরে ব্যাংকে গিয়ে ব্যবস্থাপকের কক্ষে বায়নাপত্র পড়ে বিষয়টি জানতে পারেন এবং সেখানে সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন।

এরপর এ বিষয়ে জটিলতা দেখা দিলে সমাধানের লক্ষ্যে ব্যবস্থাপকের কক্ষে বৈঠক হয়। সর্বশেষ ব্যবস্থাপক শরীফুল ইসলামদের বলেন, তাঁরা টাকা সমন্বয় করলে জমি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। বায়নাপত্রের গ্রহীতা শরীফুল ইসলাম জানান, বায়নাপত্রের পর থেকেই মিজানুর রহমান তাঁদের সঙ্গে টালবাহানা শুরু করেন। এক মাস পর তাঁকে সম্মানের সঙ্গে টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলা হলে তিনি বলেন, ‘আমি এক জবানের লোক, আমি জমি আপনাদেরই দেব।’ কিন্তু তিনি বারবার সময় নিয়ে তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা করেন।

তাঁর অভিযোগ, মিজানুর রহমান জমিটি অন্যত্র আরও বেশি দামে বিক্রি করতে চাচ্ছেন। আর এসব কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছেন ব্যাংক ব্যবস্থাপক ফয়সাল। পুরো ঘটনার বিষয়ে বায়নাপত্রের দাতা মিজানুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি সবকিছু স্বীকার করে বলেন, বায়নাগ্রহীতা সময়মতো টাকা ব্যাংকে জমা দিতে পারেননি।

এ কারণে তিনি জমি দিতে অস্বীকৃতি জানান। ঋণের আংশিক টাকা জমা দেওয়ার পর ব্যাংক ব্যবস্থাপক তাঁকে ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ করে দিয়েছেন। ইউসিবিএল ব্যাংকের চাঁদপুর শাখার ব্যবস্থাপক ফয়সাল বলেন, ‘সব ঘটনাই সত্য। কিন্তু তিনি এই বায়নাপত্রের কোথাও সাক্ষী হননি। তবে শরীফুল ইসলামদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল।

তাঁর পরামর্শে তাঁরা ঢাকার একটি শাখায় জমির মূল্য পরিমাণ টাকা জমা করেছেন, এটি সত্য।’ তিনি আরও বলেন, মিজানুর রহমানের বাড়িতে গিয়ে তাঁর স্ত্রীর অসুস্থতা দেখে বিষয়টি মানবিক মনে হয়েছে। এ কারণে তাঁর ঋণের বিষয়টি সহজ করে দেওয়া হয়েছে।

তবে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, তাঁর উপস্থিতিতে বায়নাপত্র সম্পাদন হওয়ার পর এমন ঘটনা প্রমাণ করে যে দুই পক্ষের মধ্যে তিনি বিবাদ সৃষ্টি করেছেন। এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি ব্যাংক ব্যবস্থাপক ফয়সাল।

সম্পর্কিত খবর