চাঁদপুরের ২৩২টি পূজামণ্ডপে সিসি ক্যামেরা স্থাপন : নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার

চাঁদপুর খবর রিপোর্ট : আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা-২০২৬ নির্বিঘ্ন, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনে চাঁদপুর জেলার আটটি উপজেলায় ২৩২টি পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সব পূজামণ্ডপকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে।

পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা জোরদার এবং অপতৎপরতা ও গুজব প্রতিরোধে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন পদক্ষেপ।

সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণে মাঠপর্যায়ে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করছেন প্রশাসন, পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিরা। এদিকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী পিপিএম এবং অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক পৃথকভাবে চাঁদপুরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছেন।

অন্যদিকে চাঁদপুর-৩ (সদর-হাইমচর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহম্মেদ মনিক হাইমচরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে পূজারি ও ভক্তদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেছেন। তিনি দুর্গোৎসব শেষ না হওয়া পর্যন্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।

২৩২ পূজামণ্ডপে সিসি ক্যামেরার স্থাপন : গত ৭ অক্টোবর বুধবার চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত প্রস্তুতিমূলক সভায় জেলার পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান।

সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক বলেন, সবাইকে নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন করতে হবে। সব পূজামণ্ডপকে সিসি ক্যামেরার আওতায় এনে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করা হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ও গুজব ছড়ানো প্রতিরোধে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে পূজা উদযাপন পরিষদের পাশে থেকে সহযোগিতা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, কোনো পূজামণ্ডপে সমস্যা দেখা দিলে তা দ্রুত প্রশাসনকে জানাতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য প্রচার হলে জেলা প্রশাসন বা কন্ট্রোল রুমকে অবহিত করতে হবে। পূজার সময় স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে পৃথক মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হবে। পূজামণ্ডপের আশপাশে দোকান বা বাজার থাকলেও সেখানে মেলা বসানো যাবে না। কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধেও নজরদারি বাড়ানো হবে।

সভায় চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান, জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট এ কে এম সলিম উল্যা সেলিম, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উজালা রানী চাকমা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) একরামুল ছিদ্দিক, চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি সোহেল রুশদী, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ চাঁদপুর জেলা শাখার সভাপতি সুভাষ চন্দ্র রায় ও সাধারণ সম্পাদক তমাল কুমার ঘোষসহ প্রশাসন, রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।

ডিআইজির নির্দেশনা, বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি :

শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে চাঁদপুরের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী পিপিএম। গত ১৬ অক্টোবর শুক্রবার রাতে তিনি চাঁদপুর শহরের শ্রীশ্রী কালীমন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। এ সময় মন্দিরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও পূজা উদযাপন পরিষদের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি।
পরিদর্শনকালে ডিআইজি বলেন, শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে চাঁদপুর জেলার প্রতিটি পূজামণ্ডপে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে। জেলা থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।

গতকাল শনিবার (১৭ অক্টোবর) চাঁদপুর সদর মডেল থানাধীন পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পুরান বাজার এলাকার দাসপাড়া সার্বজনীন শ্রীশ্রী শিব মন্দির ও দাসপাড়া সার্বজনীন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক।

পরিদর্শনকালে তিনি পূজামণ্ডপের সার্বিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাদিরা নূর এবং চাঁদপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফয়েজ আহমেদ।

অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, দুর্গাপূজা উপলক্ষে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কোনো অপরিচিত ব্যক্তিকে সন্দেহজনক মনে হলে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশকে অবহিত করতে হবে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সবাইকে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। যুবসমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখা এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচারণার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

হাইমচরে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে এমপি শেখ ফরিদ আহম্মেদ মনিক :

শারদীয় দুর্গোৎসব নির্বিঘ্নে ও স্বাচ্ছন্দ্যে উদযাপনে হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহম্মেদ মনিক।

গত ১৭ অক্টোবর শনিবার সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত হাইমচর উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, “আপনারা স্বাচ্ছন্দ্যে পূজা করবেন। পূজা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা এবং আমাদের নেতাকর্মীরা আপনাদের পাশে রয়েছি। আপনাদের নিরাপত্তা ও সহযোগিতার দায়িত্ব আমাদেরও রয়েছে। আমরা যেমন সুন্দরভাবে ঈদ উদযাপন করি, তেমনি আপনারাও আপনাদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা স্বাচ্ছন্দ্যে পালন করবেন।” এ সময় তিনি পূজারি ও ভক্তদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, দুর্গোৎসবের সার্বিক খোঁজখবর নেন এবং বিভিন্ন পূজামণ্ডপে আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন। বক্তব্যে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্যও দোয়া কামনা করেন।

সন্ধ্যা ৭টায় তিনি হাইমচর উপজেলার ৩ নম্বর দক্ষিণ আলগী ইউনিয়নের তেলির মোড় এলাকার জগন্নাথ মন্দিরের শারদীয় দুর্গোৎসব মণ্ডপ পরিদর্শন করেন। সেখানে জগন্নাথ মন্দির শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপন কমিটির সভাপতি সুনীল চন্দ্র মাঝির সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক রিপন স্বর্ণকারের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন হাইমচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ আলম ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম সফিক পাটওয়ারী।

পরে রাত পৌনে ৮টায় একই ইউনিয়নের কমলাপুর এলাকার আলগী দুর্গাপুর দুর্গাদেবীর মন্দির পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন সংসদ সদস্য। সেখানে মন্দির কমিটির সভাপতি আশুতোষ দাসের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক পরেশ চন্দ্র দাসের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন হাইমচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম, হাইমচর থানার ওসি শাহ আলম ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম সফিক পাটওয়ারী। এ সময় জেলা বিএনপির সহসভাপতি খলিলুর রহমান গাজী, জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইসমাইল হোসেন পাটওয়ারী, সদস্যসচিব জিয়াউর রহমান সোহাগসহ বিভিন্ন পূজামণ্ডপের উদযাপন কমিটির নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

দুর্গোৎসব ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর মতবিনিময় :

দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে উদযাপন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং যেকোনো ধরনের অপতৎপরতা প্রতিরোধে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছে চাঁদপুর জেলা বিএনপি। গতকাল ১৭ অক্টোবর শনিবার বেলা ১১টায় চাঁদপুর শহরের জে. এম. সেনগুপ্ত রোডের মুনিরা ভবনে জেলা বিএনপির উদ্যোগে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহম্মেদ মনিক। সভায় দুর্গাপূজা চলাকালে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা, ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। আট উপজেলায় ২৩২ পূজামণ্ডপ : জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুর জেলার আটটি উপজেলায় এবার মোট ২৩২টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

উপজেলাভিত্তিক পূজামণ্ডপের সংখ্যা হলো : চাঁদপুর সদর: ৪১টি, ফরিদগঞ্জ: ২৩টি, হাইমচর: ৬টি, হাজীগঞ্জ: ২৯টি, মতলব দক্ষিণ: ৩৯টি, মতলব উত্তর: ৩৬টি, কচুয়া: ৩৯টি শাহরাস্তি: ১৯টি। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গুজব ও অপতৎপরতা প্রতিরোধ এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সিসি ক্যামেরার আওতায় পূজামণ্ডপগুলোকে আনা, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের মাধ্যমে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রশাসন, পুলিশ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, পূজা উদযাপন কমিটি ও স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতায় চাঁদপুরে শারদীয় দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপিত হবে।

সম্পর্কিত খবর