শয্যার চেয়ে রোগী বেশি॥ বাড়ছে হাজীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর চাপ

সাইফুল ইসলাম সিফাত : চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এপ্রিল মাসজুড়ে চিকিৎসাসেবা নিতে রোগীর ব্যাপক চাপ লক্ষ্য করা গেছে।

বহিঃবিভাগ, জরুরি বিভাগ ও অন্তর্বিভাগ-সবখানেই ছিল রোগীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এপ্রিল ২০২৬ মাসে শয্যা অনুযায়ী রোগী ভর্তির হার দাঁড়িয়েছে ১০৬ দশমিক ০২ শতাংশে, যা হাসপাতালের নির্ধারিত ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাসিক কার্যক্রম ও সেবা বিবরণী প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বহিঃবিভাগে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন ১৭ হাজার ৬২১ জন রোগী।

একই সময়ে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩ হাজার ১৯০ জন এবং অন্তর্বিভাগে ভর্তি হয়েছেন ৫৪৮ জন। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এ সময়ে হাসপাতালে ২০টি স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হয়েছে। তবে কোনো সিজারিয়ান ডেলিভারি করা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বাভাবিক প্রসবকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

এপ্রিল মাসে হাসপাতালটিতে ১ হাজার ৩৬৫টি মাইনর সার্জারি সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি ভায়া ও ব্রেস্ট ক্যান্সার পরীক্ষাসেবা নিয়েছেন ২০০ জন নারী। সাপে কাটা রোগীর সংখ্যাও ছিল ১৮ জন।

শিশু বিভাগেও ছিল উল্লেখযোগ্য রোগীর চাপ। এক মাসে শিশু রোগী চিকিৎসাসেবা নিয়েছে ৩ হাজার ৩৭ জন। এ ছাড়া দন্ত বিভাগে ৬৭৭ জন, চক্ষু বিভাগে ৪৯৩ জন, এক্স-রে সেবা নিয়েছেন ৩৪৫ জন এবং আল্ট্রাসোনোগ্রাম করিয়েছেন ৪৪০ জন রোগী।

আর্থিক খাতের তথ্যে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসে সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ২৮২ টাকা। আগের মাস মার্চে এ পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৭৩ হাজার ২৪ টাকা। সে হিসেবে এক মাসের ব্যবধানে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহমেদ তানভীর হাসান জানান, সীমিত জনবল ও অবকাঠামো নিয়েও হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন, “এপ্রিল মাসে হাসপাতালে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে বহিঃবিভাগ ও জরুরি বিভাগে প্রতিদিনই প্রচুর রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসছেন। এরপরও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন।”

তিনি আরও বলেন, “শয্যা অনুযায়ী রোগী ভর্তির হার ১০৬ শতাংশের বেশি হওয়া হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপের ইঙ্গিত দেয়। তারপরও রোগীদের চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখতে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। পাশাপাশি স্বাভাবিক প্রসব বাড়ানো, শিশুস্বাস্থ্যসেবা জোরদার এবং ক্যান্সার স্ক্রিনিং কার্যক্রমও নিয়মিত চালু রয়েছে।”

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “হাসপাতালের সার্বিক পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে আমরা বিশেষভাবে কাজ করছি, যা সবসময় চলমান থাকবে।”

দালালচক্র নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথাও জানান তিনি। বলেন, “মাননীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশনায় দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের নিরাপত্তা ও দালাল নির্মূলে মোট ৩২টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ক্যামেরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার অফিসার ইনচার্জের তত্ত্বাবধানে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।”

স্বাস্থ্যসেবার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলায় হাসপাতালটির সক্ষমতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে শয্যা সংকট ও বহিঃবিভাগে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দিতে জনবল ও অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

৫০ শয্যা বিশিষ্ট এই হাসপাতালে হাজীগঞ্জ ছাড়াও পার্শ্ববর্তী রামগঞ্জ উপজেলা, মতলব দক্ষিণের নারায়ণপুর, কচুয়া ও শাহরাস্তি উপজেলার বড় একটি জনগোষ্ঠী চিকিৎসাসেবার জন্য নির্ভরশীল। ফলে প্রতিদিনই আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুল সংখ্যক রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, আঞ্চলিক এই চাপ বিবেচনায় হাসপাতালটির শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

সম্পর্কিত খবর