
চাঁদপুর খবর ডেক্স : জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
একই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। এ ছাড়া ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, আলী আরাফাত,
পরশ ও নিখিলের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের পরিবারকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বেলা ১২টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করেন। এর আগে সোমবার আদালত রায় ঘোষণার জন্য এ দিন ধার্য করেছিলেন। উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ১৭ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মামলাটির রায় অপেক্ষমাণ রাখেন। শুনানিতে প্রসিকিউশন আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করলেও আসামিপক্ষ তাদের খালাসের আবেদন করে। প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বৈঠকে মানুষ হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করা হয়। এ মামলায় দাখিল করা বিভিন্ন অডিও-ভিডিওতে এসবের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৫ আগস্ট পর্যন্ত নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করা হয় বলে প্রসিকিউশনের দাবি। ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম বলেন, প্রসিকিউশন এই তিন নেতার বিরুদ্ধে মূলত কমান্ড রেসপনসিবিলিটির অভিযোগ এনেছে এবং দাবি করেছে যে তারা হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক এবং যুবলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী ইসরাত জাহান বলেন, গণঅভ্যুত্থান দমনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে সাদ্দাম, ইনান, পরশ ও নিখিলের নাম আসেনি। নেতৃত্ব দিয়েছেন অন্যরা। এ ছাড়া অধীনস্থ নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ব্যর্থ হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি দাবি করে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের খালাসের আবেদন করেন।
পরে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’-এর ব্যাখ্যা দিয়ে আসামিদের অপরাধ তুলে ধরেন। আন্দোলন দমনে নেমে একজন মানুষ মারা গেলেও আসামিরা অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন—এমন আইনি যুক্তি তুলে ধরেন তিনি। এর আগে ১২ আগস্ট প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, সাত আসামির বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগই প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে এবং জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে মানুষ হত্যা ও আহত করার ঘটনায় তাদের দায় রয়েছে। এ কারণে কোনো অনুকম্পা না দেখিয়ে তাদের সর্বোচ্চ সাজা দেওয়ার আবেদন করেন তিনি। ক্তিতর্কে ওবায়দুল কাদেরের ভূমিকার ওপরও বিশেষভাবে জোর দেন চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য ছিল দায়িত্বজ্ঞানহীন ও উসকানিমূলক।
এসব বক্তব্যের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগসহ দলটির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সক্রিয় করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। মামলার অপর ছয় আসামির বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, তারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের আড়ালে থাকা দুর্বৃত্ত, দুর্নীতিবাজ ও দুষ্কৃতকারী। প্রসিকিউশনের মতে, সাত আসামির প্রত্যেকের ব্যক্তিগত দায়ের পাশাপাশি সুপিরিয়র কমান্ড বা ঊর্ধ্বতন কমান্ডের দায় রয়েছে। এসব কারণেই তাদের প্রত্যেকের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের যুক্তি অনুযায়ী, ওবায়দুল কাদের তৎকালীন সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলিতে পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতসহ অন্য নেতারাও ওই প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন বলে প্রসিকিউশন দাবি করেছে। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলন দমনে সহায়ক বাহিনী হিসেবে সরাসরি হামলায় অংশ নেন। তাদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও অঙ্গহানির অভিযোগও আনা হয়েছে।
এই মামলায় ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে আসামি করা হয়েছে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানকে।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে ট্রাইব্যুনাল সাত আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়। আইনের বিধান অনুযায়ী, আসামিদের অনুপস্থিতিতেও বিচার চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ২২ জানুয়ারি আদালত সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।
এরপর গত ৪ আগস্ট মামলায় প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শুরু হয়। পরে আসামিপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।




