
সাংবাদিকতার মাঠে প্রতিটি দিনই যেন নতুন কোনো গল্পের জন্ম দেয়। কখনো সেই গল্প মানুষের জীবনসংগ্রামের, কখনো দুর্নীতি-অনিয়মের, কখনো দুর্ঘটনা কিংবা মৃত্যুর।
আবার কখনো সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক নিজেই এমন কোনো ঘটনার অংশ হয়ে যান, যা পেশাজীবনের দীর্ঘ পথচলায় আলাদা করে মনে গেঁথে থাকে। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে গণমাধ্যমে কাজ করছি। এই দীর্ঘ সময়ে কত ঘটনা, কত পরিস্থিতি, কত বিব্রতকর মুহূর্তের মুখোমুখি হতে হয়েছে—তার হিসাব নেই। কিন্তু গত ৭ অক্টোবরের ঘটনাটি একেবারেই অন্য রকম।
ঘটনাটি বড় কোনো বিপদ কিংবা ঝুঁকির নয়; বরং একজন সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পথে সহকর্মীদের আন্তরিকতা, সহযোগিতা আর মানবিকতার এক অসাধারণ উদাহরণ। দিনটি ছিল চাঁদপুরের জন্য অত্যন্ত আলোচিত একটি ঘটনার দিন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণপিটুনিতে নিহত চাঁদপুরের আলোচিত সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মো. সেলিম খান এবং তাঁর ছেলে চিত্রনায়ক শান্ত খানের মরদেহ আদালতের নির্দেশে কবর থেকে উত্তোলন করা হয়।
দীর্ঘ সময় পর মরদেহ উত্তোলনকে ঘিরে সকাল থেকেই ঘটনাস্থলে ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসনের লোকজন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ভিড়। খবর সংগ্রহের দায়িত্বে আমিও ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর স্বাভাবিকভাবেই সংবাদ সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। ক্যামেরার সামনে কী বলা হবে, কীভাবে ঘটনাটি উপস্থাপন করা হবে, ঘটনাস্থলের কোন কোন দৃশ্য নেওয়া দরকার—এসব নিয়েই তখন ব্যস্ততা। কিন্তু তখনও বুঝতে পারিনি, সংবাদ সংগ্রহের পাশাপাশি আমাকে খুব অল্প সময়ের মধ্যে আরও একটি প্রস্তুতি নিতে হবে। আমার পরনে তখন ছিল টি-শার্ট।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে অফিস থেকে জানানো হলো, ঘটনাটি নিয়ে লাইভ সম্প্রচার হবে। বিষয়টি শুনেই বুঝলাম, আমাকে খুব দ্রুত ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু পোশাকের কথা মাথায় আসতেই কিছুটা বিব্রত হয়ে পড়লাম। টেলিভিশনের লাইভে সাধারণত সংবাদ উপস্থাপনের সময় যতটা সম্ভব পরিপাটি ও পেশাদার পোশাক থাকা প্রয়োজন। অথচ আমি তখন ঘটনাস্থলে টি-শার্ট পরা অবস্থায়। অফিসে বিষয়টি জানালাম—আমি পোশাকের দিক থেকে প্রস্তুত নই।
কিন্তু সংবাদ তো অপেক্ষা করে না। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। সকাল ১০টার খবরে লাইভে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হলো। হাতে সময় খুবই কম। ঘটনাস্থল থেকে সরে গিয়ে পোশাক পরিবর্তনের সুযোগ নেই। আবার গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনার মাঝখান থেকে চলে যাওয়াও সম্ভব নয়। সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় বাস্তবতাগুলোর একটি তখন যেন চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল—সময় কখনো সাংবাদিকের জন্য অপেক্ষা করে না।
একদিকে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ, অন্যদিকে লাইভ সম্প্রচারের প্রস্তুতি। এর মধ্যে পোশাকের বিষয়টি হয়ে দাঁড়াল বড় এক বিব্রতকর পরিস্থিতি। ঠিক সেই সময় পাশে দাঁড়ালেন ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে কর্মরত সহকর্মী সাংবাদিক মনিরুজ্জামান বাবলু ভাই। তিনি বিষয়টি বুঝতে পেরে খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে নিজের পরা ফুলহাতা শার্টটি আমাকে দেওয়ার কথা বললেন। তাঁর কথায় যেন কিছুটা স্বস্তি পেলাম। কিন্তু পরিস্থিতি আবার নতুন মোড় নিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাবলু ভাইকেও তাঁর অফিস থেকে জানানো হলো, তাকেও একসময় লাইভে যেতে হতে পারে। ফলে নিজের শার্ট খুলে দেওয়ার পর তিনিও পড়লেন বিব্রতকর অবস্থায়।
একজন সাংবাদিকের জন্য সহকর্মীর এমন সহযোগিতা সত্যিই বড় বিষয়। কারণ মাঠে আমরা একই প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করলেও প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিযোগিতা, সময়ের চাপ এবং দায়িত্বের ভার থাকে। তারপরও জরুরি মুহূর্তে একজন আরেকজনের পাশে দাঁড়ানোই মাঠ সাংবাদিকতার মানবিক দিকটি সামনে নিয়ে আসে। তবে গল্পটি এখানেই শেষ হয়নি। ঘটনাস্থলে তখন একাত্তর টেলিভিশনের ক্যামেরাম্যান শাহজাহান মিজি, যিনি সহকর্মীদের কাছে সম্রাট নামে পরিচিত, কাজ করছিলেন। পুরো পরিস্থিতি তাঁরও নজরে আসে। এরপর তিনি যা করলেন, তা আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছে। সম্রাট নিজের পরনে থাকা ফুলহাতা শার্টটি খুলে দিলেন আমাকে। এক মুহূর্তের জন্য বিষয়টি আমার কাছেও অবাক করার মতো ছিল। একজন ক্যামেরাম্যান নিজের পরা শার্ট খুলে অন্য একজন সাংবাদিককে লাইভে দাঁড়ানোর উপযোগী করে তুলছেন—মাঠ সাংবাদিকতার ব্যস্ততা ও পেশাগত প্রতিযোগিতার মধ্যে এমন দৃশ্য খুব সাধারণ নয়।
আমি দ্রুত তাঁর শার্টটি পরে নিলাম। লাইভের প্রস্তুতি শুরু হলো। কিন্তু তখন সম্রাটের নিজের কী অবস্থা? শার্টটি আমাকে দিয়ে তিনি নিজে শরীরে গামছা জড়িয়ে নিলেন। তারপর ক্যামেরা হাতে নিজের দায়িত্ব পালন করতে শুরু করলেন। আমি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে লাইভ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আর পাশে সম্রাট গায়ে গামছা জড়িয়ে ক্যামেরা পরিচালনা করছেন। একই সঙ্গে ঘটনাস্থলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য ধারণ করে চলেছেন।
দৃশ্যটি হয়তো বাইরে থেকে দেখলে খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু একজন মাঠ সাংবাদিকের কাছে এর মূল্য অনেক বেশি। কারণ সাংবাদিকতা শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার নাম নয়। এর পেছনে থাকে অনেক মানুষের শ্রম, সহযোগিতা, ত্যাগ এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
একটি টেলিভিশন লাইভের পেছনে যে সাংবাদিক ক্যামেরার সামনে থাকেন, তাঁর পাশাপাশি ক্যামেরাম্যান, ভিডিও সাংবাদিক, ডেস্ক, নিউজরুম—সবাই মিলে একটি সংবাদকে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন। মাঠে কখনো বিদ্যুৎ থাকে না, কখনো নেটওয়ার্ক থাকে না, কখনো ক্যামেরার সমস্যা হয়, কখনো নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি থাকে। কখনো আবার একটি শার্টও হয়ে ওঠে লাইভ সম্প্রচারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
৭ অক্টোবরের ঘটনাটি আমাকে সেই বাস্তবতাই নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে গণমাধ্যমে কাজ করছি। চ্যানেল ২৪-এর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এই দীর্ঘ পথচলায় নানা ধরনের ঘটনা দেখেছি। রাজনৈতিক কর্মসূচি, নির্বাচন, দুর্ঘটনা, নদীভাঙন, দুর্যোগ, প্রশাসনিক কার্যক্রম, মানবিক সংকট—কত শত ঘটনা যে কভার করেছি, তার হিসাব করা কঠিন। বিভিন্ন সময়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখিও হতে হয়েছে। কখনো প্রতিকূল আবহাওয়া, কখনো নিরাপত্তার ঝুঁকি, কখনো রাজনৈতিক চাপ, কখনো তথ্যের সংকট, আবার কখনো প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। কিন্তু পোশাকের এমন সংকট এবং তা কাটিয়ে উঠতে সহকর্মীর নিজের পরা শার্ট খুলে দেওয়ার ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।
সেদিনের ঘটনাটি তাই আমার কাছে শুধুই একটি মজার বা বিব্রতকর স্মৃতি নয়। এটি সাংবাদিকতার মাঠে সহমর্মিতা ও সহকর্মিতার একটি উদাহরণ। আমরা প্রায়ই সাংবাদিকদের মধ্যে প্রতিযোগিতার কথা বলি। কে আগে খবর দেবে, কার লাইভ আগে হবে, কার ছবিটি ভালো, কার রিপোর্ট বেশি আলোচিত হবে—এসব নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকবেই। পেশাগত উৎকর্ষের জন্য সুস্থ প্রতিযোগিতা প্রয়োজনও। কিন্তু প্রতিযোগিতার বাইরেও যে একটি বড় জায়গা আছে, সেটি হলো মানবিকতা।
৭ অক্টোবর সেই মানবিকতারই মুখ দেখেছি। মনিরুজ্জামান বাবলু ভাই নিজের শার্ট দেওয়ার কথা বলে যে আন্তরিকতা দেখিয়েছেন, সেটি আমার কাছে মূল্যবান। আর শেষ পর্যন্ত সম্রাট নিজের পরা শার্ট খুলে দিয়ে যে সহযোগিতা করেছেন, সেটি আমার সাংবাদিকতা জীবনের স্মরণীয় ঘটনাগুলোর একটি হয়ে থাকবে। সম্রাট হয়তো বিষয়টিকে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছেন। তাঁর কাছে হয়তো এটি ছিল একজন সহকর্মীকে তাৎক্ষণিক সহযোগিতা করা। কিন্তু যার প্রয়োজনের মুহূর্তে এই সহযোগিতা পাওয়া যায়, তার কাছে এর গুরুত্ব অনেক বেশি।
কারণ সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা, যেখানে অনেক সময় নিজের সমস্যার কথা ভাবার সুযোগ থাকে না।
ঘটনাস্থলে পৌঁছেই খবর সংগ্রহ করতে হয়। তথ্য যাচাই করতে হয়। ছবি ও ভিডিও নিতে হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নিতে হয়। ডেস্কে তথ্য পাঠাতে হয়। এরপর কখনো লাইভে যেতে হয়। এসবের মধ্যে ব্যক্তিগত অসুবিধা, ক্লান্তি, ক্ষুধা, বৃষ্টি কিংবা পোশাক—অনেক কিছুই গৌণ হয়ে যায়। সংবাদ তখনই বড় হয়ে ওঠে, যখন সাংবাদিক নিজের আরামের চেয়ে দায়িত্বকে বড় করে দেখেন।
তবে দায়িত্ব পালনের সেই কঠিন সময়ে সহকর্মীদের সহযোগিতা সাংবাদিককে আরও শক্তি দেয়। ৭ অক্টোবরের ঘটনাটি আমাকে আরও একটি বিষয় ভাবিয়েছে। আমরা যারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করি, তাদের কাজের অনেক গল্পই দর্শক বা পাঠকের চোখের আড়ালে থেকে যায়। দর্শক হয়তো টেলিভিশনের পর্দায় একজন সাংবাদিককে দেখেন এবং তাঁর বলা সংবাদটি শোনেন। কিন্তু সেই লাইভের আগে কী ঘটেছে, কতটা দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে, কারা পাশে দাঁড়িয়েছেন—এসব খুব কমই জানা যায়।
সেদিন আমার লাইভের গল্পটিও হয়তো পর্দায় দেখা যায়নি। দর্শক দেখেছেন একজন সাংবাদিককে ফুলহাতা শার্ট পরে লাইভে দাঁড়িয়ে খবর দিতে। কিন্তু সেই শার্টটি যে কয়েক মিনিট আগে অন্য একজনের গায়ে ছিল, সেটি হয়তো কেউ জানেননি। ক্যামেরার অপর পাশে তখন গামছা জড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই সহকর্মী—শাহজাহান মিজি ওরফে সম্রাট।
এই ছোট্ট ঘটনাটিই হয়তো সাংবাদিকতার বড় মানবিক গল্প। সাংবাদিকতার ইতিহাস শুধু বড় বড় প্রতিবেদন, অনুসন্ধান কিংবা এক্সক্লুসিভ সংবাদ দিয়ে তৈরি হয় না। এর ভেতরে থাকে অসংখ্য ছোট ছোট মুহূর্ত। কখনো সহকর্মীর হাতে এক কাপ চা, কখনো বিপদের সময় একটি ফোনকল, কখনো ক্যামেরা ধরার সহযোগিতা, আবার কখনো নিজের পরা একটি শার্ট খুলে দিয়ে অন্যকে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। এই ছোট ছোট মানবিক ঘটনাগুলোই মাঠ সাংবাদিকতাকে বাঁচিয়ে রাখে। ৭ অক্টোবর আমার জন্য তাই শুধু একটি সংবাদ সংগ্রহের দিন ছিল না। এটি ছিল পেশাগত দায়িত্ব, সময়ের চাপ, বিব্রতকর পরিস্থিতি এবং সহকর্মীদের আন্তরিকতার এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
সেদিন আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ দিয়েছি। কিন্তু সেই সংবাদের সঙ্গে আরও একটি গল্প আমার সঙ্গে থেকে গেছে—সহকর্মীর শার্টের গল্প। হয়তো একদিন এই ঘটনা মনে পড়বে এবং মনে হবে, সাংবাদিকতার দীর্ঘ পথচলায় সব খবর মনে থাকে না। সব লাইভের কথাও মনে থাকে না। কিন্তু কিছু মুহূর্ত থেকে যায়।
৭ অক্টোবরের সেই মুহূর্তটিও থেকে যাবে। একজন সহকর্মীর শার্ট, আরেকজনের গায়ে জড়ানো গামছা, হাতে ক্যামেরা এবং সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একটি লাইভ সংবাদ—এই দৃশ্য হয়তো সাংবাদিকতার পাঠ্যবইয়ে লেখা থাকবে না। কিন্তু আমার সাংবাদিকতা জীবনের ব্যক্তিগত স্মৃতির পাতায় এটি অবশ্যই লেখা থাকবে। কারণ সংবাদ মানুষকে খবর দেয়, আর কখনো কখনো মানুষই সাংবাদিককে খবরের কাছে পৌঁছে দেয়।
লেখক : আল ইমরান শোভন
সাবেক সাধারণ সম্পাদক, চাঁদপুর প্রেস ক্লাব।
জেলা প্রতিনিধি, চ্যানেল ২৪ ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
বার্তা সম্পাদক, দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহ।




