চাঁদপুর রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের কাছে পুরানবাজারের হাসপাতালটির দায়িত্ব হস্তান্তরের দাবি

চাঁদপুর খবর রিপোট: চাঁদপুর রেড ক্রিসেন্ট পরিচালিত পুরানবাজারের হাসপাতালটির দায়িত্ব হস্তান্তর ও পুনরায় চালুর দাবি উঠেছে। দীর্ঘদিন পর হাসপাতালটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চাঁদপুর জেলা রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের অ্যাডহক কার্যনির্বাহী কমিটির প্রথম সভায় হাসপাতালটি চাঁদপুর ইউনিটের দায়িত্বে দেওয়ার দাবি উঠেছে।

গত ১৯ আগস্ট বুধবার বিকেল ৫টায় চাঁদপুর রেড ক্রিসেন্ট ভবনের ইউনিট কার্যালয়ে ওই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন চাঁদপুর রেড ক্রিসেন্ট অ্যাডহক কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি ও চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট এ কে এম সলিম উল্লা সেলিম। সভায় চাঁদপুর ইউনিটকে হাসপাতালটির দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন পর যদি হাসপাতালটি পুনরায় চালু করা যায়, তাহলে চাঁদপুরসহ আশপাশের জেলার দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবার নতুন দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।

চাঁদপুর শহরের পুরান বাজার এলাকায় মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর সংযোগস্থলে একসময় গড়ে উঠেছিল একটি মানবিক চিকিৎসাসেবার অনন্য প্রতিষ্ঠান—‘রেড ক্রস মেটারনিটি হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’। বাংলাদেশ রেড ক্রস/ক্রিসেন্ট সোসাইটির উদ্যোগে এবং ডেনিশ রেড ক্রস সোসাইটির আর্থিক সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত এ হাসপাতালটি একসময় চাঁদপুরসহ আশপাশের কয়েকটি জেলার দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের চিকিৎসার অন্যতম নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল ছিল।

বিশেষ করে গর্ভবতী মা ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮৪ সালে ২০ শয্যাবিশিষ্ট এ হাসপাতালটি চালু করা হয়। একই সঙ্গে নির্মাণ করা হয় বহুতল ভবন। হাসপাতাল চালুর সময় সেখানে ডেনমার্কের দুজন ও বাংলাদেশের দুজন চিকিৎসকসহ প্রায় ৪০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই হাসপাতালটি চাঁদপুর সদর, ফরিদগঞ্জ, হাইমচর, মতলব ছাড়াও শরীয়তপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলার দরিদ্র মানুষের কাছে আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

অর্থায়ন বন্ধ, শুরু হয় সংকট : হাসপাতালের কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে ১৯৯৪ সালে। ওই বছর ডেনিশ রেড ক্রসের আর্থিক সহায়তার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে হাসপাতালটি তীব্র অর্থসংকটে পড়ে। অর্থের অভাবে একে একে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি ছেড়ে চলে যান। আবার কয়েকজনকে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি অন্যত্র বদলি করে। একপর্যায়ে হাসপাতালের কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়ে। ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রায় দুই বছর হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ২০০০ সালের অক্টোবর মাসে হাসপাতালের বকেয়া দেনার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে ১১ জন কর্মচারীর ৩৯ মাসের সম্মানী ও ভাতা বাবদ প্রায় ১৫ লাখ টাকা, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও টেলিফোন বিল বাবদ ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা এবং বদলি বা চাকরি ছেড়ে যাওয়া কর্মচারীদের বকেয়া সম্মানী ও ভাতা বাবদ প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ছিল।

চাঁদপুর ইউনিটের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর : পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জাতীয় সদর দপ্তর একটি চুক্তির মাধ্যমে ২০০০ সালের অক্টোবর থেকে পাঁচ বছরের জন্য হাসপাতালটি চাঁদপুর রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের কাছে হস্তান্তর করে। উদ্দেশ্য ছিল হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান উন্নত করা এবং পুনরায় কার্যক্রম সচল করা। একই সঙ্গে হাসপাতালের বিদ্যমান বকেয়া অর্থ জাতীয় সদর দপ্তর থেকে পরিশোধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর চাঁদপুর ইউনিটের উদ্যোগে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা পুনরায় চালু করা হয়। কিন্তু চিকিৎসকের সংকটের কারণে মাত্র তিন মাস কার্যক্রম চালানোর পর আবারও তা বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে জাতীয় সদর দপ্তর থেকে বকেয়া বিলগুলো পরিশোধ না করায় হাসপাতালের আর্থিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়। একপর্যায়ে ২০০৭ সালে বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের কারণে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড হাসপাতালটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর বিশাল হাসপাতাল ভবন ও আশপাশের এলাকা অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন আলোহীন ও জনশূন্য থাকায় এলাকাটি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে এবং সেখানে অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের আনাগোনা ও আড্ডা বাড়তে থাকে।

নতুন ব্যবস্থাপনায়ও ফেরেনি কাঙ্ক্ষিত গতি : পরবর্তীতে হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জাতীয় সদর দপ্তর যাবতীয় বকেয়া বিল পরিশোধ এবং কর্মচারীদের বকেয়া সম্মানী ও ভাতা সর্বোচ্চ দুই বছরের মধ্যে পরিশোধের শর্তে ২০১১ সালের ১৪ নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত ১০ বছরের জন্য গিয়াস উদ্দিন মঞ্জুরা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট পরিচালনার চুক্তি সম্পাদন করে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা এ প্রতিষ্ঠানটি তার অতীতের সেই সেবামূলক অবস্থানে আর ফিরতে পারেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতাল ভবন ও অবকাঠামোও ব্যবহারের বাইরে পড়ে থাকে। ফলে বিপুল সম্ভাবনাময় একটি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে।

পুরোনো হাসপাতাল, নতুন সম্ভাবনা : মেঘনা ও ডাকাতিয়ার মিলনস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা এই হাসপাতাল শুধু একটি ভবন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে চাঁদপুরের মানুষের চিকিৎসাসেবার ইতিহাস। একসময় যে প্রতিষ্ঠানে দরিদ্র গর্ভবতী মা ও শিশুরা চিকিৎসা পেতেন, চিকিৎসক ও কর্মচারীদের কর্মচাঞ্চল্যে যে প্রাঙ্গণ মুখর থাকত, দীর্ঘদিন ধরে সেই প্রতিষ্ঠানই পড়ে আছে নীরব ও অচল অবস্থায়।

চাঁদপুরের সচেতন মহলের প্রত্যাশা—সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে হাসপাতালটির বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংস্কার, অর্থায়ন ও জনবল নিশ্চিত করবে। বিশেষ করে চাঁদপুর রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে আধুনিক ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটি আবারও তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে পারে।
একসময় যে হাসপাতালটি নদীবিধৌত এই জনপদের অসহায় মানুষের চিকিৎসার ভরসা ছিল, সময়ের ব্যবধানে সেই প্রতিষ্ঠান আজ পুনর্জাগরণের অপেক্ষায়।

এখন প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা। তাহলেই রেড ক্রিসেন্টের এই পুরোনো হাসপাতালটি আবারও হয়ে উঠতে পারে চাঁদপুরের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের চিকিৎসার অন্যতম নিরাপদ আশ্রয়।

সম্পর্কিত খবর