চাঁদপুরে মা ইলিশ সংরক্ষণে ভিজিএফের চাল বিতরণ

বিশেষ প্রতিনিধি : মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করা, ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে জেলেদের খাদ্যসহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে চাঁদপুরে ভিজিএফের চাল বিতরণ ও জনসচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকাল ১১টায় চাঁদপুর সদর উপজেলার পশ্চিম দাসাদী বড় খানবাড়ির মাঠে মৎস্য অধিদপ্তর, চাঁদপুরের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।

তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘বুকে হাত দিয়ে বলুন, কোনো ইলিশ ধরব না।’ মা ইলিশ সংরক্ষণে জেলেদের নিজেদের দায়িত্ববোধ থেকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ইলিশের প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা দেশের মৎস্যসম্পদ রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাময়িকভাবে মাছ ধরা বন্ধ রাখার মধ্য দিয়েই ভবিষ্যতে আরও বেশি ইলিশ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। নিজের পরিচয় তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘আমি কৃষকের সন্তান বলতে গর্ববোধ করি।’ কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে দেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ খাতের মানুষের উন্নয়নে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। মৎস্য খাতে সরকারের সহায়তার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, মৎস্য অভিযানকে কেন্দ্র করে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ খাদ্যসহায়তা প্রদান করে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেরা যাতে খাদ্যসংকটে না পড়েন, সে জন্য সরকারি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে শুধু সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল না থেকে জেলেদের বিকল্প আয়ের উৎস তৈরির প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, জেলেদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে খাঁচায় ভাসমান মাছ চাষের মতো আধুনিক পদ্ধতি চালু করতে হবে। বিকল্প পদ্ধতিতে মাছ চাষের মাধ্যমে জেলেরা নিষেধাজ্ঞার সময়েও আয়ের সুযোগ পেতে পারেন। এ জন্য সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগী হতে হবে এবং নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে আগ্রহী হতে হবে। চাঁদপুরের মৎস্যসম্পদের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, সারা বাংলাদেশে চাঁদপুরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ইলিশ উৎপাদন, নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি এবং মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে এ জেলার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সম্পদ সংরক্ষণ করা গেলে দেশের অর্থনীতি যেমন উপকৃত হবে, তেমনি জেলেদের জীবনমান উন্নয়নের পথও সুগম হবে।

তিনি বলেন, ‘আপনাদের অর্থনীতিকে কীভাবে শক্তিশালী করা যায়, আমরা তা নিয়ে কাজ শুরু করেছি।’ জেলেদের জীবনমান উন্নয়ন, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক বলেন, মা ইলিশ সংরক্ষণ শুধু মৎস্য অধিদপ্তর বা প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়। এ সম্পদ রক্ষায় জেলে, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় জনগণ সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ এবং চাঁদপুরের পরিচিতি ও অর্থনীতির সঙ্গে এ মাছের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। পদ্মা-মেঘনার ইলিশকে কেন্দ্র করে বহু পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে। তাই মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে সরকারি নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। সাময়িক সংযম ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জেলেদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।

সংসদ সদস্য আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের জীবন-জীবিকা যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সরকার ভিজিএফ কর্মসূচির মাধ্যমে খাদ্যসহায়তা দিচ্ছে। এ সহায়তা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব। তিনি মা ইলিশ রক্ষায় জেলেদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, নিষিদ্ধ সময়ে নদীতে ইলিশ ধরা, অবৈধ জাল ব্যবহার এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার মতো কর্মকাণ্ড থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও আয়বর্ধক কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে মৎস্যজীবী পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন।

জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক, পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান ও নৌ পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান প্রমুখ। চাঁদপুর সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ওমর ফারুকের সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম। অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াত করেন সদর উপজেলা মসজিদের ইমাম মোজাহিদ ইসলাম।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট এ কে এম সালিম উল্লাহ সেলিম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) একরামুল সিদ্দিক, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম এন জামিউল হিকমা, চাঁদপুর জেলা বিএনপির সহসভাপতি জসিম উদ্দিন খান বাবুল, দেওয়ান মো. সফিকুজ্জামান, খলিলুর রহমান গাজী, সাংগঠনিক সম্পাদক মনির চৌধুরী, সহসভাপতি ফেরদৌস আলম বাবু ও ডি এম শাহাজাহান, পৌর বিএনপির সভাপতি আক্তার হোসেন মাঝি, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শাহজালাল মিশন, সাধারণ সম্পাদক হযরত আলী ঢালী, জেলা যুবদলের সভাপতি মানিকুর রহমান মানিক, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন খান আকাশ,

সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ বাহার, জেলা কৃষক দলের সভাপতি এনায়েত উল্যাহ খোকনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

উল্লেখ্য, মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে গত ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের জন্য পদ্মা-মেঘনাসহ নির্ধারিত নদ-নদীতে ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। এ সময়ে ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিপণনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সরকারি বিধিনিষেধ মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সম্পর্কিত খবর