ট্রান্সফরমার চুরি রোধে ব্যর্থতা, আদালতের আদেশে মতলব উত্তর থানার ওসিকে অপসারণ

চাঁদপুর খবর রিপোর্ট : চাঁদপুরের মতলব উত্তরে বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চুরি প্রতিরোধে ধারাবাহিক ব্যর্থতা এবং চুরির ঘটনায় মামলা না নেওয়ার অভিযোগে আদালতের আদেশের পর মতলব উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কামরুল হাসানকে বদলি করা হয়েছে। তাঁকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশে সংযুক্ত করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশাসন) নাজিমুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এটি রুটিন বদলির অংশ।

এর আগে গত ৯ সেপ্টেম্বর চাঁদপুরের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. নসরুল্লাহর আদালত ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় মামলা না নেওয়ায় ওসি কামরুল হাসানকে দায়িত্ব পালনে ‘অযোগ্য ও অদক্ষ’ বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ও চাঁদপুরের পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন আদালত।

আদালতের আদেশে বলা হয়, আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ওসির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে তা সার্ভিস বুকে সংরক্ষণ করতে হবে এবং আদালতকে বিষয়টি অবহিত করতে হবে। একই আদেশে মামলা হিসেবে নথিভুক্ত না হওয়া ২৩টি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় তিন কার্যদিবসের মধ্যে এফআইআর করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

সাড়ে তিন মাসে ২৫ ট্রান্সফরমার চুরি :

আদালত সূত্রে জানা গেছে, চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জেনারেল ম্যানেজার সাড়ে তিন মাসে ২৫টি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় পৃথকভাবে মামলা করার জন্য মতলব উত্তর থানায় আবেদন করেন। এর মধ্যে ২৩টি আবেদন এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত না করায় ওসি কামরুল হাসানকে আদালতে হাজির হয়ে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে তিনি লিখিত জবাব দিয়ে অব্যাহতি প্রার্থনা করেন।

লিখিত জবাবে ওসি দাবি করেন, বাদীর পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর না থাকায় মামলা করা সম্ভব হয়নি। তবে আদালত নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখতে পান, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রতিটি আবেদনে ঘটনার স্থান, তারিখ এবং চুরি হওয়া ট্রান্সফরমারের সিরিয়াল নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য উল্লেখ ছিল।

আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, গত ১ মে থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত ২৫টি স্মারকের মাধ্যমে ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় মামলা করার আবেদন করা হলেও ৪ আগস্ট দুটি ঘটনায় আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে প্রতিবেদন চাওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো মামলা করেননি ওসি। পরবর্তী সময়েও অবশিষ্ট ২৩টি আবেদনের বিষয়ে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া পর্যন্ত মামলা করা হয়নি।

এফআইআর না নেওয়ায় আদালতের কঠোর পর্যবেক্ষণ :

আদেশে আদালত মন্তব্য করেন, ট্রান্সফরমার চুরির মতো আমলযোগ্য অপরাধের অভিযোগ পাওয়ার পরও এফআইআর না করা দায়িত্বে অবহেলার শামিল। এর ফলে পল্লী বিদ্যুতের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ চুরির পুনরাবৃত্তি উৎসাহিত হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়ে জনদুর্ভোগ ও জনরোষ সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে আদালত পর্যবেক্ষণ করেন।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, আমলযোগ্য অপরাধের সংবাদ পাওয়ার পরও এফআইআর না করে ওসি পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গলের ২৪৩ ও ২৪৪ বিধি এবং ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৫৪ ধারার বিধান লঙ্ঘন করেছেন।

আদালতের আদেশে বলা হয়, তাঁর এমন নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্বে অবহেলা দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ১৬৬ ও ২১৭ ধারা এবং দ্য পুলিশ অ্যাক্ট, ১৮৬১-এর ২৯ ধারার আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধের বিষয় হতে পারে।

আদেশে আরও বলা হয়, ‘নিষ্ক্রিয়, উদাসীন ও দায়িত্বে অবহেলাকারী’ ব্যক্তি থানার ওসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অযোগ্য ও অদক্ষ—বিষয়টি আদালতের কাছে সুস্পষ্ট। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়।

এদিকে আদালতের এমন পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার পরই মতলব উত্তর থানার ওসি মোহাম্মদ কামরুল হাসানকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশে বদলি করা হলো।

সম্পর্কিত খবর