চাঁদপুর প্যাসিফিক একাডেমির বিরুদ্ধে ‘ফ্রি’ জাপানি ভাষা কোর্সের নামে প্রতারণার অভিযোগ

চাঁদপুর খবর রিপোর্ট : চাঁদপুর শহরের ওয়ারলেছ বাজার বিলকিস ভিলা (২য়তলা) সি.এন.জি স্ট্রেশন সংলগ্ন প্যাসিফিক একাডেমীর বিরুদ্ধে জাপানি ভাষা শেখানোর ‘ফ্রি কোর্সে’ ভর্তি হয়ে তিন মাস ক্লাস করার পর নিজের এসএসসি ও এইচএসসির মূল সার্টিফিকেট এবং মার্কশিট ফেরত না দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ করেছেন চাঁদপুরের এক শিক্ষার্থী।

এ ঘটনায় প্যাসিফিক একাডেমির সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে চাঁদপুর সদর মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন নাহিদুল ইসলাম (২১) নামে এক শিক্ষার্থী।

ঘটনাটি সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে—জাপানি ভাষা শেখানোর একটি কোর্সে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কেন শিক্ষাগত যোগ্যতার মূল সনদ ও মার্কশিট জমা রাখা হচ্ছে এবং কোর্স শেষে তা ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হলো কেন? প্যাসিফিক একাডেমি, চাঁদপুরের নামে প্রকাশিত ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে জাপানি ভাষার Level-N5 শিক্ষা কোর্সে ভর্তির আহ্বান জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে তিন মাসের ফ্রি ক্লাস, ফ্রি বই, প্রতি সপ্তাহে পরীক্ষা ও প্রশ্নপত্র সমাধান, NAT/JLPT পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য মক টেস্ট এবং প্রতিষ্ঠান থেকে সার্টিফিকেট দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে কোর্সে ভর্তির জন্য সর্বনিম্ন এইচএসসি বা সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং ১৮ থেকে ২৬ বছর বয়সসীমার কথা বলা হয়েছে। একই বিজ্ঞপ্তির ‘ভর্তির শর্ত’ অংশে বলা হয়, ভর্তি হওয়ার পর শিক্ষাগত যোগ্যতার মূল কপিগুলো প্রতিষ্ঠানে জমা রাখতে হবে। বাছাইকৃত শিক্ষার্থীদের ভর্তি ফি হিসেবে ১ হাজার টাকা দেওয়ার কথাও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ রয়েছে।

তিন মাস পরও ফেরত মেলেনি মূল সনদ শিক্ষার্থীর অভিযোগ : থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে নাহিদুল ইসলাম দাবি করেন, বিজ্ঞপ্তি দেখে তিনি প্রায় তিন মাস আগে প্যাসিফিক একাডেমিতে যান। প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলার পর তাকে ভর্তি হতে হলে এসএসসি ও এইচএসসির মূল সার্টিফিকেট এবং মূল মার্কশিট জমা দিতে হবে বলে জানানো হয়।

অভিযোগে বলা হয়, নাহিদুল সরল বিশ্বাসে তার এসএসসি ও এইচএসসির মূল সার্টিফিকেট ও মার্কশিট প্রতিষ্ঠানে জমা দেন।
এরপর তিনি প্রায় তিন মাস নিয়মিত জাপানি ভাষার ক্লাস করেন। কোর্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নিজের মূল সনদ ও মার্কশিট ফেরত চাইলে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ‘দিচ্ছি’ বলে সময়ক্ষেপণ করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। সনদ চাইতে গিয়ে দুর্ব্যবহার ও হুমকির অভিযোগ : নাহিদুলের অভিযোগ, একপর্যায়ে তিনি বারবার মূল সার্টিফিকেট ও মার্কশিট ফেরত চাইলে তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়। গত ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে একাডেমিতে গিয়ে সনদ চাইলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

থানায় দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে সনদ ও মার্কশিট ফেরত দেওয়ার জন্য মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয় এবং টাকা না দিলে ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয়। অনলাইন প্রচারণাতেও জাপানি ভাষা কোর্সের তথ্য : অনলাইনে পাওয়া প্যাসিফিক একাডেমির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি জাপানি ভাষার N5সহ বিভিন্ন কোর্স এবং JLPT/NAT প্রস্তুতির কথা প্রচার করে। চাঁদপুর শাখার একটি অনলাইন তালিকাতেও জাপানি ভাষা শিক্ষা, JLPT/NAT প্রস্তুতি, মক টেস্ট ও বিনামূল্যে বই দেওয়ার মতো সুবিধার প্রচারণা পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে N5 কোর্সকে প্রাথমিক পর্যায়ের জাপানি ভাষা শিক্ষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং কোর্সে বই, সার্টিফিকেট ও JLPT/NAT প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে।মূল সনদ জমা রাখার শর্তেই কি তৈরি হচ্ছে ঝুঁকি?

এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সময় শিক্ষার্থীর এসএসসি-এইচএসসির মূল সনদ ও মার্কশিট জমা রাখার প্রয়োজনীয়তা কতটা যুক্তিসংগত এবং এসব নথি সংরক্ষণ ও ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের লিখিত নীতিমালা কী? কারণ, শিক্ষাগত যোগ্যতার মূল সনদ একজন শিক্ষার্থীর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত নথি। সনদ ফেরত না পাওয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা শিক্ষার্থীর পরবর্তী শিক্ষা, চাকরি বা বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি করতে পারে। পুলিশের তদন্তেই বেরিয়ে আসবে প্রকৃত ঘটনা : নাহিদুল ইসলাম ১৫ সেপ্টেম্বর চাঁদপুর সদর মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়ে তার এসএসসি ও এইচএসসির মূল সার্টিফিকেট ও মার্কশিট উদ্ধার এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছেন।

বিষয়টি চাঁদপুর সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ফয়েজ আহমেদকে অবগত করা হয়েছে ।

এ বিষয়ে চাঁদপুর প্যাসিফিক একাডেমির পরিচালক খাতুনে জান্নাত রিয়া দৈনিক চাঁদপুর খবরকে বলেন, “আমাদের প্রতিষ্ঠানের শর্ত হলো শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাস করতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস না করলে তাকে পূর্ণ কোর্স ফি পরিশোধ করে সার্টিফিকেট নিতে হবে। নাহিদুল ইসলাম নিয়মিত ক্লাস করেনি। সে কারণে তার মূল শিক্ষাগত সনদ আমাদের কাছে রাখা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, নিয়মিত ক্লাস না করায় প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী ওই শিক্ষার্থীকে কোর্স সম্পন্ন করতে হলে পূর্ণ কোর্স ফি পরিশোধ করতে হবে।

তবে প্যাসিফিক একাডেমির ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে কোর্সটিকে ‘ফ্রি জাপানি ভাষা কোর্স’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও নিয়মিত ক্লাস না করলে ১৫ হাজার টাকা পূর্ণ কোর্স ফি নেওয়ার বিষয়টি কীভাবে প্রযোজ্য এবং এ অর্থ নেওয়ার যৌক্তিকতা কী—এমন প্রশ্ন করা হলে এর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি পরিচালক খাতুনে জান্নাত রিয়া।

ফলে বিজ্ঞপ্তিতে ‘ফ্রি কোর্স’ উল্লেখ থাকা এবং পরবর্তীতে অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে ১৫ হাজার টাকা কোর্স ফি দাবি করার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ অর্থের ভিত্তি, লিখিত শর্ত এবং শিক্ষার্থীর মূল সনদ আটকে রাখার বৈধতা—এসব বিষয়ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

সম্পর্কিত খবর