চাঁদপুরসহ ছয় জেলায় ২ লাখ ৩৯ হাজার গ্রাহকের গ্যাস সরবরাহে নানা সীমাবদ্ধতা

চাঁদপুর খবর রিপোর্ট : দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ হ্রাস, পুরোনো পাইপলাইন, অবৈধ গ্যাস সংযোগ এবং চাহিদার তুলনায় সরবরাহের ঘাটতির কারণে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (বিজিডিসিএল)। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর—এই ছয় জেলার ৩৫টি উপজেলায় গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটি নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বিজিডিসিএল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির অধিক্ষেত্রাধীন এলাকায় ২১২ দশমিক ১৫ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন এবং ৩ হাজার ৬৮২ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার বিতরণ লাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণির মোট ২ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৬ জন গ্রাহককে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। বিস্তৃত এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রাহকদের চাহিদা পূরণে কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও নানা কারণে কাঙ্ক্ষিত চাপে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

বিজিডিসিএল ১৯৮০ সালের ৭ জুন গ্যাস উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের দায়িত্ব নিয়ে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তী সময়ে সরকারি সিদ্ধান্তে ১৯৮৯ সালে উৎপাদন কার্যক্রম বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) কাছে এবং ২০০৪ সালে সঞ্চালন কার্যক্রম গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের গ্যাস বিতরণের জন্য কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি গঠিত হলে বিজিডিসিএলের বিতরণ কার্যক্রমের পরিধি ও আর্থিক সক্ষমতা আরও সীমিত হয়ে পড়ে।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা ইপিজেড ছাড়া বিজিডিসিএলের আওতায় উল্লেখযোগ্য কোনো শিল্পাঞ্চল নেই। ফলে প্রতিষ্ঠানটির আয়ের বড় অংশ আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে অন্যান্য গ্যাস বিতরণ কোম্পানির আওতায় একাধিক ইপিজেড, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান থাকায় তাদের আর্থিক সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বেশি।

এ প্রসঙ্গে কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার লুটেরচর এলাকায় মেঘনা গ্রুপ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিষয়টিও উল্লেখ করেছে বিজিডিসিএল কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, অর্থনৈতিক অঞ্চলটি ভৌগোলিকভাবে বিজিডিসিএলের আওতাভুক্ত হলেও এটি তিতাস গ্যাস কোম্পানির অধীনে দেওয়া হয়েছে। ওই অর্থনৈতিক অঞ্চল বিজিডিসিএলের আওতায় দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত।

গ্যাসের মূল্য ও আবাসিক গ্রাহকদের বরাদ্দের ক্ষেত্রেও আর্থিক চাপের বিষয়টি তুলে ধরেছে প্রতিষ্ঠানটি। কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ২০১৭ সালের আগে একটি ডাবল বার্নারের জন্য মাসে ৮৭ দশমিক ৯১ ঘনমিটার এবং সিঙ্গেল বার্নারের জন্য ৮২ দশমিক ৪২ ঘনমিটার গ্যাস বরাদ্দ নির্ধারিত ছিল। পরবর্তী সময়ে বরাদ্দ কমিয়ে ২০২২ সালে ডাবল বার্নারের জন্য ৬০ ঘনমিটার এবং সিঙ্গেল বার্নারের জন্য ৫৫ ঘনমিটার নির্ধারণ করা হয়। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, বাস্তবে একটি ডাবল বার্নারের গ্রাহক মাসে প্রায় ৯০ ঘনমিটার এবং সিঙ্গেল বার্নারের গ্রাহক প্রায় ৮৫ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করেন। ফলে নির্ধারিত বরাদ্দ ও প্রকৃত ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

গ্যাস সরবরাহে সীমাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসেবে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ও সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছে বিজিডিসিএল। জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ হ্রাস পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় প্রয়োজনীয় চাপে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এ ছাড়া পুরোনো পাইপলাইন ও সরবরাহ নেটওয়ার্কও বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের গ্যাস পাইপলাইন, টিবিএস ও ডিআরএস নেটওয়ার্ক ১৯৮০-এর দশকে এবং কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলের নেটওয়ার্ক ১৯৮৬ সালে স্থাপন করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে এসব পাইপলাইনের সক্ষমতা বর্তমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে তৃতীয় পক্ষের ক্ষতিসাধনের কারণে পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটছে। এতে সরবরাহের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে।

অন্যদিকে, বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ ও অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহারের কারণেও বৈধ গ্রাহকরা প্রয়োজনীয় চাপে গ্যাস পাচ্ছেন না। অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদে বিজিডিসিএল নিজস্ব দল ও মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বিজিডিসিএল কর্তৃপক্ষের মতে, একদিকে পুরোনো ও জরাজীর্ণ সরবরাহ নেটওয়ার্ক, অন্যদিকে নেটওয়ার্কের সক্ষমতার তুলনায় অধিক চাহিদা—এই দুই কারণে বিদ্যমান সব গ্রাহকের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। সীমিত পরিমাণ গ্যাস দিয়ে পুরোনো নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রাহকদের সেবা দিতে প্রতিষ্ঠানটি সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ আশা প্রকাশ করেছে, গ্যাসের চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ নিশ্চিত করা, পুরোনো পাইপলাইন ও নেটওয়ার্কের সমস্যা সমাধান, অবৈধ গ্যাস সংযোগ ও ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হলে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

সম্পর্কিত খবর