
শুরু হয়েছে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের অভিযান। এ অভিযান সফল করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিস-আদালত ছেড়ে নেমে পড়েছেন নদীতে।
এ উপলক্ষে নৌকা বাইচেরও আয়োজন করা হচ্ছে। এতে অংশ নেবেন প্রশাসনের কর্মকর্তা, গণমাধ্যমকর্মী ও সাংবাদিক, জেলে এবং রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। অথচ দুই দিনের অভিযান শেষ হলেও থামছে না ইলিশ ধরা। এখনই জরুরি ভিত্তিতে টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যথায় ইলিশ সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।
২২ দিনের এ অভিযানে সচেতনতা কার্যক্রমের পাশাপাশি ইলিশ ধরার জাল, জেলে ও নৌকা আটক, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড এবং নৌকা-জাল পুড়িয়ে ফেলার মতো কর্মসূচি চলবে। বছরের পর বছর এসব কর্মসূচি চালানো হলেও ইলিশের দাম কেজিপ্রতি তিন হাজার টাকায় পৌঁছেছে। সাধারণ মানুষের অনেকে ইলিশ খাওয়া তো দূরের কথা, বহু বছর ধরে ইলিশের গন্ধও পাননি। এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়।
একসময়ের ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটি এখন যেন নিছক গল্প আর বিনোদনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে দেশীয় প্রজাতির অনেক মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর, টেকসই ও সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে ইলিশসহ মৎস্যসম্পদ নানা সংকটের মুখে পড়ছে। ইলিশ সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে এই জাতীয় সম্পদ ক্রমেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
ইলিশ শুধু একটি মাছের নাম নয়। এটি বাংলাদেশের নদী, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, জীবিকা ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি জাতীয় সম্পদ। দেশের মানুষের খাদ্যতালিকা থেকে শুরু করে জেলে পরিবারের জীবন-জীবিকা—সব ক্ষেত্রেই ইলিশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই ইলিশ রক্ষা মানে শুধু একটি মাছের প্রজাতি রক্ষা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাকে সুরক্ষা দেওয়া।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল প্রায় ৫ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টন, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২০ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। দেশের মোট মাছ উৎপাদনে একক প্রজাতি হিসেবে ইলিশের অবদান প্রায় ১২ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, ইলিশ সংরক্ষণকে আর বিচ্ছিন্ন কোনো কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনা।
নিষেধাজ্ঞা আছে, কিন্তু ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর?
ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের আহরণ নিষেধাজ্ঞা বহু বছর ধরে কার্যকর রয়েছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০১৭ সালে প্রধান প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞার সময় ২২ দিনে উন্নীত করা হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের সমন্বয়ে অভিযান পরিচালিত হয়।
পাশাপাশি জাটকা সংরক্ষণ, ইলিশ অভয়াশ্রম পরিচালনা এবং জেলেদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করার উদ্যোগও রয়েছে। বর্তমানে মৎস্য অধিদপ্তর পাঁচটি ইলিশ অভয়াশ্রম পরিচালনা, বিকল্প আয়মূলক কার্যক্রম এবং নিষেধাজ্ঞার সময় খাদ্যসহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু নিষেধাজ্ঞা ও অভিযান দিয়ে কি ইলিশ রক্ষা সম্ভব? আমার উত্তর—না। নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন, অভিযান প্রয়োজন, আইন প্রয়োগও প্রয়োজন। তবে এর পাশাপাশি দরকার নদী ও জলজ পরিবেশ রক্ষা, অবৈধ জাল নিয়ন্ত্রণ, জেলেদের বাস্তবভিত্তিক সহায়তা, বাজার ব্যবস্থাপনা, মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে নজরদারি এবং সাধারণ মানুষের দায়িত্বশীল আচরণ।
২০২৬ সালে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত। এ সময় ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ।
ইলিশ রক্ষায় নৌকা ও জাল জমা নেওয়ার প্রস্তাব
এ বিষয়ে গত মাসে রাজধানীর মিরপুর প্রেস ক্লাবের আয়োজনে ইলিশ সম্পদ রক্ষায় করণীয় নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে আমি মূল প্রবন্ধ পাঠ করি এবং একটি প্রস্তাবনা তুলে ধরি।
আমার প্রস্তাবনা অনুযায়ী, প্রথম করণীয় হলো—সরকারের মৎস্য অধিদপ্তর থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। ওই প্রজ্ঞাপনের আওতায় ইলিশের প্রজনন এলাকার তালিকাভুক্ত জেলেদের মাছ ধরার নৌকা ও জাল ৫ অক্টোবরের মধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অথবা সংশ্লিষ্ট মৎস্য কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে। জমা দেওয়ার পর প্রত্যেক জেলেকে জমার রসিদ সংগ্রহ করতে হবে। নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন জেলেদের নৌকা ও জাল সরকারের হেফাজতে থাকবে। যেসব জেলে নৌকা ও জাল জমা দেবেন, কেবল তাঁরাই সরকারি সহায়তা পাওয়ার যোগ্য হবেন।
সরকারি এ প্রজ্ঞাপন বাস্তবায়নের জন্য ইলিশের প্রজনন এলাকার নদী ও রাস্তাঘাটে ব্যাপক মাইকিং এবং সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জেলে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা যেতে পারে। প্রজনন মৌসুমে নদীর নির্ধারিত এলাকায় মাছ ধরার নৌযান চলাচল ও মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
এ প্রস্তাব কার্যকর করা গেলে ইলিশ রক্ষার নামে সরকারের জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও মৎস্য কর্মকর্তাদের নিয়মিত সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি নদীতে অভিযান পরিচালনার চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে নৌকা বাইচের মতো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির পরিবর্তে বাস্তবভিত্তিক সংরক্ষণ কার্যক্রমে অধিক গুরুত্ব দেওয়া যাবে।
প্রতি বছর ইলিশ রক্ষায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদেরও জেলেদের হামলা, মারধর ও লাঞ্ছনার শিকার হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। অন্যদিকে, আইন অমান্য করার অভিযোগে অনেক জেলেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং তাঁদের নৌকা ও জাল জব্দ বা ধ্বংস করা হয়। এতে জেলেদের বিপুল পরিমাণ সম্পদের ক্ষতি হয়। নিষেধাজ্ঞার সময় দেশের বিভিন্ন এলাকার অনেক জেলে কারাদণ্ডের শিকার হলে তাঁদের পরিবারকে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়।
তাই ইলিশ সংরক্ষণে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জেলেদের জীবিকা, সম্পদ ও মানবিক দিকটিও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
প্রথম করণীয়: মা ইলিশকে প্রজননের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে ইলিশের জীবনচক্র নদী ও সমুদ্র—উভয় পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত। তাই প্রজনন মৌসুমে নদীর প্রজনন এলাকায় সব ধরনের অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ, ইলিশ ধরার নৌযান ও সরঞ্জামের ওপর কার্যকর নজরদারি, গুরুত্বপূর্ণ প্রজননস্থলে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, রাতের অভিযান জোরদার, নৌপথে সমন্বিত টহল এবং মাছের আড়ত ও অবতরণকেন্দ্রে নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে অভিযান চললেও বাজারে ইলিশ বিক্রি অব্যাহত থাকলে সেই ব্যবস্থাপনা কার্যকর হতে পারে না। মাছ ধরার উৎস থেকে শুরু করে পরিবহন, আড়ত, বাজার এবং ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।
দ্বিতীয় করণীয়: জেলেকে প্রতিপক্ষ নয়, সংরক্ষণের অংশীদার করতে হবে ইলিশ সংরক্ষণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হলেন জেলেরা। একজন দরিদ্র জেলে নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে না নামলে তাঁর পরিবারের খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবন কীভাবে চলবে—এই প্রশ্নের বাস্তবসম্মত উত্তর না দিয়ে শুধু আইন প্রয়োগ করলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
মৎস্য অধিদপ্তরের চলমান কর্মসূচিতে নিষেধাজ্ঞার সময় খাদ্যসহায়তা ও বিকল্প আয়মূলক কার্যক্রমের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে আমাদের প্রয়োজন ‘জেলে সহায়তা’ থেকে ‘জেলে পুনর্বাসন ও সক্ষমতা উন্নয়ন’-এর দিকে এগিয়ে যাওয়া।
নিষেধাজ্ঞার সময় প্রকৃত জেলে পরিবারগুলোকে সঠিকভাবে শনাক্ত করতে হবে। খাদ্যসহায়তা সময়মতো পৌঁছাতে হবে, বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে, ক্ষুদ্রঋণ বা সুদমুক্ত অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে, জেলেদের সন্তানদের শিক্ষা সহায়তা দিতে হবে এবং জেলে পরিবারের নারীদের আয়মূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে হবে।
জেলেকে যদি বলা হয়—‘তুমি মাছ ধরবে না, কিন্তু তোমার পরিবারের দায়িত্ব রাষ্ট্র নেবে’, তাহলে সংরক্ষণ কার্যক্রমে তাঁদের অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী হবে।
তৃতীয় করণীয়: অবৈধ ও ধ্বংসাত্মক জাল বন্ধ করতে হবে ইলিশের জন্য বড় বিপদগুলোর একটি হলো ছোট মাছ ও জাটকা নির্বিচারে আহরণ এবং ক্ষতিকর জালের ব্যবহার। সরকারি প্রকল্পের নথিতেও ক্ষতিকর ও অবৈধ জাল-সরঞ্জাম নির্মূলকে ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে শুধু জাল জব্দ ও ধ্বংস করলেই হবে না। সরকারকে দেখতে হবে—জাল কোথায় তৈরি হচ্ছে, কারা বিক্রি করছে, কারা কিনছে, কোথায় ব্যবহার হচ্ছে এবং কারা এর পেছনে অর্থ জোগাচ্ছে।
অর্থাৎ অবৈধ জালের বিরুদ্ধে অভিযানকে নদী থেকে বাজার ও উৎপাদন পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে।
চতুর্থ করণীয়: জাটকা রক্ষায় বছরব্যাপী কর্মসূচি প্রয়োজন ইলিশ সংরক্ষণকে শুধু অক্টোবরের ২২ দিনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। একটি মা ইলিশকে রক্ষা করার অর্থ হলো ভবিষ্যতের বিপুলসংখ্যক ইলিশের সম্ভাবনা রক্ষা করা। একইভাবে ছোট ইলিশ বা জাটকা বড় হওয়ার সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে তা প্রজননক্ষম মাছে পরিণত হবে।
তাই জাটকা সংরক্ষণে বছরব্যাপী নদীভিত্তিক নজরদারি, জাটকার বিচরণক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ, নিয়মিত অভিযান, বাজার পর্যবেক্ষণ, জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্কুল-কলেজে প্রচারাভিযান চালু রাখা প্রয়োজন।
মৎস্য অধিদপ্তরও ২০২৬ সালে জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ উপলক্ষে ইলিশ গবেষণা, জাটকা সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে কর্মশালার উদ্যোগ নিয়েছে। এতে বোঝা যায়, গবেষণাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
পঞ্চম করণীয়: নদীকে বাঁচাতে হবে ইলিশ রক্ষার সবচেয়ে বড় কর্মক্ষেত্র হলো নদী। নদী দূষিত হলে, নাব্যতা কমে গেলে, প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হলে, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে কিংবা নির্বিচারে বালু উত্তোলন ও অন্যান্য পরিবেশগত ক্ষতি ঘটলে শুধু মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইলিশের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা যাবে না।
তাই ইলিশ অভয়াশ্রমকে শুধু মানচিত্রের একটি সীমারেখা হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত প্রতিবেশব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নদী রক্ষা, পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণ, প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং নৌযান চলাচলের প্রভাব মূল্যায়ন—সবকিছুকেই ইলিশ ব্যবস্থাপনার অংশ করতে হবে।
ষষ্ঠ করণীয়: বাজারে ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে আমরা প্রায়ই দেখি, নদীতে অভিযান চলছে; কিন্তু বাজারে কিংবা ঘরে ঘরে অবৈধভাবে আহরিত মাছ পৌঁছে যাচ্ছে। এই ব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি।
প্রজনন মৌসুমে শুধু জেলেকে দায়ী করলে হবে না। অবৈধ মাছের ক্রেতা, বিক্রেতা, আড়তদার, পরিবহনকারী ও মজুতকারীদেরও আইন অনুযায়ী জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কারণ, বাজারে ক্রেতা থাকলে নদীতে অবৈধ আহরণের প্রবণতাও বজায় থাকে।
এ জন্য স্থানীয় প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বাজার কমিটিকে নিয়ে সমন্বিত বাজার নজরদারি গড়ে তোলা যেতে পারে। সপ্তম করণীয়: ইলিশ সংরক্ষণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে
বর্তমান সময়ে নদী পাহারা দেওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো সম্ভব। নির্দিষ্ট এলাকায় জিপিএসভিত্তিক নৌযান পর্যবেক্ষণ, ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি, মোবাইল অ্যাপভিত্তিক অভিযোগ ব্যবস্থা, ডিজিটাল জেলে তালিকা, ভর্তুকি ও সহায়তার ডিজিটাল হিসাব এবং অভিযানের তথ্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
একই সঙ্গে কোন এলাকায় কতটি অভিযান হয়েছে, কত জাল জব্দ করা হয়েছে, কত মামলা হয়েছে এবং কতজন জেলে সহায়তা পেয়েছেন—এসব তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করলে জবাবদিহি বাড়বে।
অষ্টম করণীয়: গবেষণাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে আনতে হবে ইলিশের প্রজনন, বিচরণ, খাদ্যাভ্যাস, পানির পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নদীর প্রবাহ এবং সমুদ্রের পরিবেশ নিয়ে নিয়মিত গবেষণা প্রয়োজন।
মৎস্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে ইলিশের টেকসই উৎপাদন ও জাটকা সংরক্ষণ নিয়ে গবেষণা এবং সংরক্ষণ কৌশল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে মৎস্য অধিদপ্তর ‘Conservation Strategy for Brood Hilsa & Jatka to Increase Sustainable Production of Hilsa’ শীর্ষক কার্যপরিধি (Terms of Reference) প্রকাশ করেছে।
এই উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করে গবেষণা, তথ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়ন ও মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন—এই তিনটি বিষয়কে একসূত্রে আনতে হবে।
নবম করণীয়: ভোক্তার সচেতনতাই হতে পারে বড় শক্তি ইলিশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকার বা জেলেদের নয়। একজন সাধারণ ক্রেতাও এই সংরক্ষণ ব্যবস্থার অংশ।
প্রজনন মৌসুমে অবৈধভাবে ধরা ইলিশ না কেনা, জাটকা না কেনা এবং অবৈধ মাছ বিক্রির তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোও নাগরিক দায়িত্ব।
আমাদের মনে রাখতে হবে, আজ আমরা যে ইলিশ অবৈধভাবে কিনছি, সেটি হয়তো আগামী প্রজন্মের হাজারো ইলিশের জন্ম দেওয়ার সুযোগ হারানোর কারণ হচ্ছে।
ইলিশ সংরক্ষণে ১০ দফা প্রস্তাবনা
ইলিশ রক্ষায় কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে নিম্নোক্ত ১০টি প্রস্তাব বিবেচনার জন্য তুলে ধরছি—
১. মা ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হবে।
২. নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগেই প্রকৃত জেলে পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণে বছরব্যাপী নদী ও বাজার নজরদারি চালাতে হবে।
৪. অবৈধ ও ধ্বংসাত্মক জালের উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার—তিন পর্যায়েই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. ইলিশ অভয়াশ্রমগুলোকে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে।
৬. ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্রের নদী-পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
৭. জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানকে প্রকল্পনির্ভর না রেখে দীর্ঘমেয়াদি করতে হবে।
৮. ইলিশ পরিবহন, আড়ত ও বাজারে ডিজিটাল ও সমন্বিত নজরদারি বাড়াতে হবে।
৯. ইলিশ গবেষণার ফলাফল নিয়মিত প্রকাশ করে তার ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা সংশোধন করতে হবে।
১০. সরকার, মৎস্য বিভাগ, জেলে, ব্যবসায়ী, গবেষক, সাংবাদিক ও সাধারণ ভোক্তাদের নিয়ে জাতীয় ইলিশ সংরক্ষণ অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে।
শেষ কথা
আমরা যদি সত্যিই ইলিশকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে দেখতে চাই, তাহলে শুধু নিষেধাজ্ঞার দিন গুনলে চলবে না। আমাদের ভাবতে হবে, আগামী ১০, ২০ কিংবা ৫০ বছর পর বাংলাদেশের নদীতে ইলিশ থাকবে কি না। আজ আমরা যে সিদ্ধান্ত নেব, তার ফল ভোগ করবে আগামী প্রজন্ম।
তাই ইলিশকে বাঁচাতে হলে নদীকে বাঁচাতে হবে। নদীকে বাঁচাতে হলে জেলেকে বাঁচাতে হবে। জেলেকে বাঁচাতে হলে তাঁকে সংরক্ষণের অংশীদার করতে হবে। আর সংরক্ষণ কার্যক্রম সফল করতে হলে সরকার, প্রশাসন ও জনগণকে একই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।
ইলিশ রক্ষা কোনো একক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ‘আজ বেশি ইলিশ’ নয়; বরং ‘প্রতি বছর টেকসইভাবে ইলিশ উৎপাদন’।
ইলিশ বাঁচুক, নদী বাঁচুক, জেলে ও বাংলাদেশের অর্থনীতি বাঁচুক।
লেখক: আহমেদ আবু জাফর
চেয়ারম্যান, ট্রাস্টি বোর্ড, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম
সভাপতি, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, বাংলাদেশ
মোবাইল: ০১৭১২৩০৬৫০১




