
এস. এম ইকবাল, ফরিদগঞ্জ :সরকারি অফিস। অথচ সেখানে সেবা নিতে গিয়ে যদি জনগণকেই বারবার ঘুরতে হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক, নিয়ন্ত্রণ আসলে কার হাতে?
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ঘিরে এমনই নানা অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দলিল লেখক সমিতির একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে স্বাভাবিক দলিল রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে জমি-জমা সংক্রান্ত কাজে আসা সাধারণ মানুষকে পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে।
অভিযোগ রয়েছে, সপ্তাহের প্রতিটি কর্মদিবসে দলিল রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম না হওয়ায় অনেককেই একাধিকবার অফিসে আসতে হচ্ছে। এতে নষ্ট হচ্ছে সময়, বাড়ছে যাতায়াতসহ অন্যান্য খরচ।
ফরিদগঞ্জ একটি প্রবাসী অধ্যুষিত উপজেলা। জমি-জমা সংক্রান্ত কাজে দেশের বাইরে থাকা অনেক প্রবাসীর পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আসতে হয়। দলিল রেজিস্ট্রেশন, তল্লাশি ও নকল সংগ্রহসহ বিভিন্ন সেবা নিতে আসা এসব মানুষ নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করতে না পারলে তাদের বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়।
স্থানীয়দের প্রশ্ন,একটি সরকারি অফিসে কোন দিন দলিল রেজিস্ট্রেশন হবে, আর কোন দিন হবে না, এ সিদ্ধান্ত কি সরকারি বিধি অনুযায়ী হওয়ার কথা, নাকি দলিল লেখকদের সুবিধা-অসুবিধার ওপর নির্ভর করবে?
দলিল লেখক সমিতির একাধিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সপ্তাহের প্রতিটি কর্মদিবসে দলিল রেজিস্ট্রেশন হলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করতে তাদের সময়ের সংকট হয়।
তাদের ভাষ্য, খাজনা, নামজারি ও অন্যান্য কাগজপত্র সংগ্রহের পাশাপাশি দলিলের টাইটেল প্রস্তুত করতে হয়। প্রতিদিন দলিল হলে কাজের চাপ বেড়ে যায়।
তবে একই সঙ্গে তারা স্বীকার করেন, নিয়মিত দলিল রেজিস্ট্রেশন হলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন এবং সাব-রেজিস্ট্রারের ওপরও কাজের চাপ কমবে।।এখানেই উঠছে প্রশ্ন? জনগণের সেবা নিশ্চিত করা হবে, নাকি একটি সংগঠনের সদস্যদের কাজের সুবিধা বিবেচনায় সরকারি সেবা সীমিত থাকবে?
ফরিদগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ঘিরে ওঠা অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়টি। প্রতিবেদকের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, প্রতি দলিলে ১ হাজার টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন দলিল লেখক সমিতির সভাপতি আবদুল কাদের। অফিসের মোহরার মামুনও টাকা নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে জানা গেছে।
তবে এই টাকা কোন খাতে নেওয়া হচ্ছে, এটি সরকারি নির্ধারিত ফি কি না এবং এর কোনো বৈধ রসিদ দেওয়া হয় কি না,এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। যদি সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে কোনো অর্থ আদায় হয়ে থাকে, তাহলে সেটির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফরিদগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রার তানভীর আলমের সঙ্গে সাংবাদিক পরিচয়ে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। মেসেজ পাঠিয়েও সাক্ষাৎকারের জন্য যোগাযোগ করা হয়।।পরে সরাসরি অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
জেলা রেজিস্ট্রার মো. আকবর আলীর বক্তব্য জানতে তাঁর অফিসিয়াল মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিস জনগণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবাকেন্দ্র। জমি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজে মানুষকে এখানে আসতে হয়। ফলে নির্ধারিত কর্মদিবসে নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করা এবং সরকারি বিধি অনুযায়ী ফি আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোনো বেসরকারি সংগঠন বা ব্যক্তি সরকারি দাপ্তরিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছে কি না, অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগের সত্যতা কী এবং নির্ধারিত কর্মদিবসে সেবা কার্যক্রম সীমিত রাখার পেছনে প্রকৃত কারণ কী—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
সরকারি রেজিস্ট্রি অফিস কি জনগণের সেবার জন্য, নাকি কোনো ‘সিন্ডিকেটের’ সুবিধার জন্য? অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সরকারি ফি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়ে স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের জন্য নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।




