সাহিত্য একাডেমি চাঁদপুরের বান্দরবান ভ্রমণগাথা : উজ্জ্বল হোসাইন

সূচনা ও যাত্রার পূর্বকথা :

সাহিত্য কেবল বইয়ের পাতায় কিংবা শব্দমালায় সীমাবদ্ধ থাকে না সাহিত্যের মূল নির্যাস লুকিয়ে থাকে প্রকৃতির অসীম ক্যানভাসে, মানুষের পারস্পরিক সৌহাদের্য এবং ভ্রমণের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায়। সাহিত্য একাডেমি চাঁদপুর সবসময়ই লেখকদের সৃজনশীল মননকে সমৃদ্ধ করতে এবং সদস্যদের মাঝে পারস্পরিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় আয়োজিত হয়েছিল তিন দিনব্যাপী স্মরণীয় বার্ষিক আনন্দ ভ্রমণ। প্রাত্যহিক জীবনের ব্যস্ততা, যান্ত্রিক কোলাহল এবং নাগরিক ক্লান্তি পেছনে ফেলে সাহিত্য একাডেমির সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা মিলে মনস্থির করলেন রূপসী বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্যমণ্ডিত অঞ্চল পার্বত্য জেলা বান্দরবান ভ্রমণের।

এই আনন্দ ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য ছিল সবুজ পাহাড়ে ঘেরা নৈসর্গিক পরিবেশে সাহিত্য চর্চা, আত্মিক মেলবন্ধন ও প্রকৃতির কাছাকাছি কিছুদিন কাটানো। ২৯ অক্টোবর রাতে যখন চাঁদপুর শহর ধীরে ধীরে নিঝুম স্বপ্নে ঢলে পড়ছিল, ঠিক তখনই শুরু হলো এক রোমাঞ্চকর যাত্রার উপক্রম।

রাতের নীরবতা চিরে বাসযাত্রা ও প্রাণের আড্ডা :

২৯ অক্টোবর রাত ঠিক সাড়ে ১১টা। চাঁদপুর বাসস্ট্যান্ডে একে একে সমবেত হতে লাগলেন সাহিত্যিক, কবি, লেখক, গবেষক এবং তাদের পরম প্রিয় পরিবারবর্গ। সবার চোখেমুখে এক অধীর আগ্রহ ও ভ্রমণের আনন্দ-উচ্ছ্বাস। নির্ধারিত সৌদিয়া বাসটি প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। যাত্রার শুভ সূচনায় লেখক ও গবেষক মুহাম্মদ ফরিদ হাসানের সাবলীল সঞ্চালনায় এক সংক্ষিপ্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শুরুতেই ভ্রমণকারীদের উদ্দেশ্যে উষ্ণ স্বাগত ঘোষণা দেন কবি ও লেখক মাইনুল ইসলাম মানিক।

এরপর সাহিত্য একাডেমির মহাপরিচালক কাদের পলাশ সকলের উদ্দেশ্যে অত্যন্ত মূল্যবান দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি সফরের শৃঙ্খলা বজায় রাখা, ছোটদের যত্ন নেওয়া এবং ভ্রমণের প্রতি মুহূর্তকে সাহিত্যের ভাবরসে উপভোগ করার আহ্বান জানান। পরবর্তীতে যাত্রা যেন সম্পূর্ণ নিরাপদ, আনন্দদায়ক ও সুন্দর হয়, সেজন্য সৃষ্টিকর্তার দরবারে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন মুহাম্মদ হানিফ চোকদার। মোনাজাত শেষে রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে সৌদিয়া বাসটি চাঁদপুর বাসস্ট্যান্ড ছেড়ে পাহাড়ি জেলা বান্দরবানের পথে যাত্রা শুরু করল।

বাস চলতে শুরু করতেই ভেতরের আবহাওয়া হয়ে উঠল প্রাণবন্ত ও সুরময়। শুরু হলো সাহিত্যিক ও লেখকদের আড্ডা, জটলা এবং সঙ্গীতের সুরধ্বনি। রাত যত বাড়তে লাগল, বাসের ভেতরের গানে আড্ডা তত জমে উঠল। পথিমধ্যে বাসটি কুমিল্লার অদূরে অবস্থিত বিখ্যাত ‘টাইমস স্কয়ার’-এ প্রথম যাত্রা বিরতি দেয়। সেখানে সবাই বাস থেকে নেমে রাতের স্নিগ্ধ বাতাসে একটু হাত-পা ছড়িয়ে নেন এবং হালকা নাস্তা সেরে নেন।

নাস্তা শেষে বাস পুনরায় পাহাড়ি দূরপথের উদ্দেশ্যে চলতে থাকে। রাতের বেলা অনেকের চোখে ঘুমের আমেজ নেমে আসলেও ভ্রমণকারীদের একাংশ তখনও ছিল সঙ্গীতে মশগুল। মুহাম্মদ ফরিদ হাসানের প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় গানে মেতে ওঠেন কাজী রাসেল, শাদমান শরীফ, আরিফুল ইসলাম শান্ত ও ইমরান শাকির ইমরু। তাদের কণ্ঠে ভেসে আসা সুরের মূর্ছনায় বাসে থাকা ছোট শিশুরা কিছুটা বিরক্ত ও ঘুমকাতুড়ে হয়ে পড়লেও গানপ্রেমী বড়দের মন ছিল একদম মুগ্ধ ও উল্লসিত। চট্টগ্রাম অতিক্রম করার পর সাতকানিয়ার ‘সি ওয়ার্ল্ড রিসোর্টে’ দ্বিতীয়বারের মতো যাত্রা বিরতি দেওয়া হয়। দীর্ঘ রাতের ক্লান্তি দূর করে সবাই সেখানে একটু চা-পানের বিরতি নেন।

পাহাড়ি বাঁক অতিক্রম ও হোটেল হিলভিউতে আগমন :

৩০ অক্টোবর সকালে সাতকানিয়া পেরিয়ে বাস যত বান্দরবানের কাছাকাছি পৌঁছাতে লাগল, ততই রাস্তার দুই পাশের ভূপ্রকৃতি বদলাতে শুরু করল। ভোরের আবছা আলোয় দেখা মিলল উঁচু-নিচু পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ, যার বুক চিরে বাস চলতে থাকে সাবলীল গতিতে। দুই পাশের পাহাড়, গাঢ় সবুজ গাছপালা আর ভোরের কুয়াশার চাদর সবাইকে এক অন্য জগতে নিয়ে গেল। অঁাকাবঁাকা ও রোমাঞ্চকর পথ অতিক্রম করে অবশেষে সকাল ঠিক ৭টায় বাস পৌঁছাল বান্দরবান শহরের পাহাড় ঘেরা মনোরম পরিবেশের ‘হোটেল হিলভিউ’-তে।

বাস থেকে নেমে সবাই সকালের মিঠে রোদে হোটেল হিলভিউয়ের নিচের রেস্তোরাঁয় প্রাতরাশ বা সকালের নাস্তা সেরে নেন। তবে হোটেলে পৌঁছানোর পর কিছুটা সাময়িক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সকালে মাত্র ২টি রুম খালি থাকায় সবাইকে সাথে সাথে কক্ষে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়নি। বাকি রুমগুলো পেতে পেতে দুপুর ১২টা বেজে যায়। দীর্ঘ জার্নির পর রুম না পাওয়ায় সবার মাঝে কিছুটা ক্লান্তি ও অস্বস্তি দেখা গেলেও ভ্রমণের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের সামনে তা ফিকে হয়ে যায়।

দুপুর ১২টায় সকল রুমের চাবি পাওয়া মাত্রই আনন্দ ভ্রমণ উপ-কমিটির আহ্বায়ক মাইনুল ইসলাম মানিক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে যে যার পরিবার ও পছন্দ অনুযায়ী কক্ষগুলো বুঝিয়ে দেন। সবাই নিজ নিজ কক্ষে গিয়ে দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি দূর করতে গোসল ও ধোয়ামোছা সেরে মানসিকভাবে সতেজ হয়ে ওঠেন।

স্বর্ণমন্দির পরিদর্শন :

সতেজ হয়ে সবাই সিদ্ধান্ত নিলেন বান্দরবানের বিখ্যাত ‘স্বর্ণমন্দির’ (বুদ্ধ ধাতু জাদী) দর্শন করার। দ্রুত গাড়িযোগে সবাই স্বর্ণমন্দিরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। তবে সেখানে পৌঁছে জানা গেল, বিশেষ সুরক্ষার কারণে দর্শনার্থীদের জন্য মূল মন্দিরে প্রবেশ আপাতত বন্ধ রয়েছে। এতে সাময়িক কিছুটা মন খারাপ হলেও সাহিত্য একাডেমির দল দমে যাননি। তারা দূর থেকেই স্বর্ণমন্দিরের চমৎকার নির্মাণশৈলী ও পাহাড়ি চূড়ায় সোনালী আভা উপভোগ করলেন এবং ভ্রমণ তালিকার ডায়েরিতে স্বর্ণমন্দির দেখার আনন্দ যোগ করে নিলেন। ফেরার পথে সাঙ্গু নদীর ঘোলা পানি দেখে লেখকের স্ত্রী মন্তব্য জুড়ে দেন এটি আমাদের পুরাণবাজারের সেতু সাথে পদ্মার ঘোলা পানি। কারণ পাহাড় থেকে নেমে আসা পানি ঘোলাটে হয়।

জুমআর নামাজ ও দুপুরের আহার :

স্বর্ণমন্দির প্রাঙ্গণ থেকে সবাই পুনরায় হোটেলে ফিরে আসেন। রুমে এসে হাত-মুখ ধুয়ে কিছুটা বিশ্রাম নেওয়া হয়। এরপর জুম্মার নামাজের সময় হওয়ায় পুরুষ সদস্যরা স্থানীয় কেন্দ্রীয় মসজিদে গিয়ে পবিত্র জুম্মার নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে দুপুর বেলা সবাই একত্রিত হয়ে ‘হোটেল লন্ডন ডাইন’-এ দুপুরের খাবারের উদ্দেশ্যে গমন করেন। সেখানে পাহাড়ি চালের ভাত ও ব্যঞ্জন দিয়ে সবাই দুপুরের আহার সম্পন্ন করেন। আহারের শুরুতে লেখকে মুখে ধরা পড়ে লবন বিহীন রান্না। সাথে সাথে তিনি হোটেল মালিককে অবগত করলে অবশ্য তরকারিতে লবন দেয়া হয়। আমাদের প্রিয় নানা ভাইয়ে খাবার শেষে উক্তিটি ছিলো খুবই হাস্যরসাত্মক খাবার কেমন হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই নানা ভাইয়ে উক্তি ছিলো পানিটা সুস্বাদু ছিলো।

মেঘলা রিসোর্ট ও নীলাচলের নৈসর্গিক রূপ সুষমা :

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বিকেল ঠিক ৩টায় চঁাদপুর সাহিত্য একাডেমির দল বের হলো বান্দরবানের অন্যতম দুই পর্যটন কেন্দ্র ‘মেঘলা’ ও ‘নীলাচল’-এর উদ্দেশ্যে। পাহাড়ি উঁচুনীচু রাস্তায় ভ্রমণের জন্য চড়ে বসা হলো তিনটি বিখ্যাত ‘চঁাদের গাড়ি’-তে (খোলা জিপ)। পাহাড়ি হাওয়া গায়ে মেখে গাড়িগুলো প্রথমে গিয়ে থামল ‘মেঘলা রিসোর্ট’-এর সামনে। প্রবেশমূল্য ছিল জনপ্রতি ৫০ টাকা। আনন্দ ভ্রমণ উপ-কমিটির আহ্বায়ক মাইনুল ইসলাম মানিক সামনে দাঁড়িয়ে সার্বিক দায়িত্ব নিয়ে একে একে সবার টিকিট কেটে মেঘলা রিসোর্টে প্রবেশ করালেন।

মেঘলা রিসোর্টের প্রবেশপথেই রয়েছে অদ্ভুত এক পাহাড়ি ভৌগোলিক গঠন প্রথমে উঁচু স্থান থেকে বেশ খানিকটা নিচে নেমে যেতে হয়, এরপর আবার হেঁটে উঁচুতে উঠতে হয়। সারারাতের বাস জার্নি ও দুপুরের ক্লান্তির পর এই চড়াই-উৎরাই কিছুটা কষ্টদায়ক ও অস্বস্তিকর মনে হলেও, মেঘলার অপার সৌন্দর্য মুহূর্তের মধ্যেই সবার সব ক্লান্তি দূর করে দিল। চারপাশের সবুজ পাহাড়, লেকের শান্ত পানি, কেবল কার ও ঝুলন্ত সেতু সবাইকে বিমোহিত করে। ঝুলন্ত সেতুতে দাড়িয়েঁ সবাই ফটোসেশনে মেতে ওঠেন এবং রঙিন মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দী করেন। এখানে শাদ আল-আমিন তাঁর নতুন বউ ও শালিকে নিয়ে ক্যাবল কারে উঠার দৃশ্যটি ছিলো রোমাঞ্জকর।

মেঘলা রিসোর্ট ঘুরে দেখার পর সেখান থেকে গাড়িগুলো ছুটল বহুল কাঙ্ক্ষিত ‘নীলাচল’-এর উদ্দেশ্যে। ঠিক বিকেল ৪টায় চাঁদের গাড়িগুলো গিয়ে পৌঁছাল নীলাচলের পাহাড় চূড়ায়। নীলাচলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চোখে না দেখলে ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব! যেন প্রকৃতির এক অপরূপ মায়াবী রূপের খেলা বসেছে এখানে। নীলাচলের একদম চূড়ায় দাঁড়িয়ে পুরো বান্দরবান শহরকে নিচে পুতুলের মতো দেখা যাচ্ছিল। চারদিকে যেদিকেই চোখ যায়, শুধুই পাহাড় আর সবুজ অরণ্যের তরঙ্গ।

ভ্রমণকারীরা নীলাচলের বিভিন্ন ভিউ পয়েন্টে ঘুরে ঘুরে ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পাহাড়ি তরতাজা পেঁপে ও মিষ্টি কলা খেয়ে সবাই মন ও প্রাণকে পরিতৃপ্ত করেন। বিকেলের সূর্য যখন পাহাড়ি দিগন্তে ধীরে ধীরে হেলে পড়ছিল, তখন নীলাচলের রূপ আরও মায়াবী হয়ে ওঠে। প্রকৃতি দেখার তৃষ্ণা মিটিয়ে সবাই আবার হোটেলের উদ্দেশ্যে ফেরত আসেন। তবে পরিচালক (গবেষণা) মুহাম্মদ ফরিদ হাসান নীলাচলেই রয়ে গেলেন, কারণ চাঁদপুরের সাবেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদা কুলসুম হীরা মনি (যিনি বর্তমানে বান্দরবান জেলায় কর্মরত) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ ও সৌজন্য বিনিময়ের সূচি ছিল।

বার্মিজ মার্কেটে কেনাকাটা ও নৈশভোজ :

হোটেলে ফিরে সবাই হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নেন। এরপর সন্ধ্যা নামতেই হোটেলের লবি ও পাশেই অবস্থিত স্থানীয় বিখ্যাত ‘বার্মিজ মার্কেট’-এ নেমে পড়েন কেনাকাটার উদ্দেশ্যে। সবাই নিজেদের জন্য এবং প্রিয়জনদের জন্য পাহাড়ি চাদর, আচার, বার্মিজ জুতো, কাঠের তৈরি নানা হস্তশিল্প সামগ্রী কেনাকাটা শুরু করেন।

কেনাকাটা শেষে পূর্বে ঘোষিত সময় অনুযায়ী ঠিক রাত ৯টায় সবাই আবার ‘লন্ডন ডাইন’ রেস্তোরঁায় একত্রিত হন রাতের খাবারের জন্য। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে অনেকেই আহার শেষে দ্রুত রুমে গিয়ে ঘুমের দেশে তলিয়ে যান। এভাবে আনন্দ ও রোমাঞ্চে ভরপুর বার্ষিক ভ্রমণের প্রথম দিনটি সফলভাবে সমাপ্ত হয়। ঘুমানোর আগেই ঘোষণা দেওয়া হয়, পরদিন ভোর সাড়ে ৫টায় নীলগিরির উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া হবে।

নীলগিরির পথে ও ভোরের কুয়াশাচ্ছন্ন রোমাঞ্চ :

৩১ অক্টোবর, ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন। পূর্ব ঘোষণা মেনে সাহিত্য একাডেমির সকল সদস্য ও তাদের পরিবার ভোর সাড়ে ৫টার মধ্যেই প্রস্তুত হয়ে হোটেলের সামনে চলে আসেন। তবে কিছু আনুষঙ্গিক বিলম্বের কারণে নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা পর, অর্থাৎ সকাল সাড়ে ৬টায় চাঁদের গাড়িগুলো নীলগিরির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। যাত্রা পথে উদ্দেশ্য ছিল নীলগিরির পথেই সেনাবাহিনীর পরিচালিত রেস্টুরেন্টে নাস্তা সেরে নেওয়া।

পাহাড়ি অঁাকাবঁাকা ও মেঘে ঢাকা রাস্তা দিয়ে চাঁদের গাড়ি যখন ওপরের দিকে উঠছিল, তখন চারপাশের দৃশ্য ছিল এক কথায় অবিশ্বাস্য! দুই পাহাড়ের বুক চিরে ভেসে আসা অজস্র সাদা মেঘের সারি যেন পুরো পর্যটক দলকে শূন্যে ভাসিয়ে রেখেছিল। চেক পয়েন্টে সেনাবাহিনী পরিচালিত আর্মি ক্যান্টিন/রেস্টুরেন্টে পৌঁছে সবাই ধোঁয়া ওঠা গরম নাস্তা সেরে নেন। এরপর আবার গাড়ি চলতে শুরু করে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩০০০ ফুট ওপরে অবস্থিত নীলগিরির উদ্দেশ্যে।

মেঘের স্বর্গরাজ্য নীলগিরি ও টাইটানিক ভিউ পয়েন্ট :

অবশেষে গাড়ি এসে পেঁৗছাল নীলগিরির প্রবেশদ্বারে। প্রবেশপথেই স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষজন নানা পদের সতেজ পাহাড়ি ফল নিয়ে বসে ছিল। পাহাড়ি পেঁপে, মিষ্টি কলা, জাম্বুরা, মিষ্টি আখ, ডাব, ড্রাগন ফল এবং স্থানীয় কমলা দেখে কারও মুখেই জল আটকে থাকেনি। গাড়ি থেকে নেমেই সবাই ফলমূল খাওয়ার আনন্দে মেতে ওঠেন।

এরপর ১০০ টাকা প্রবেশমূল্যের বিনিময়ে নীলগিরির মূল প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন সবাই। সাজানো-গোছানো, পরিচ্ছন্ন ও সুউচ্চ এই পর্যটনকেন্দ্র দেখে সবার চোখ ছানাবড়া! চূড়ায় বসে মনে হচ্ছিল, সামনাসামনি দঁাড়িয়ে থাকা অন্য পাহাড়গুলো হাতছানি দিয়ে ডাকছে আর মেঘের দল এসে গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে। নীলগিরির হেলিপ্যাডে সাহিত্য একাডেমির সকল সদস্য, পরিচালক, কবি ও তাদের পরিবারবর্গ একত্রিত হয়ে এক স্মরণীয় গ্রুপ ছবিতে অংশ নেন। এরপর শুরু হয় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ছবি তোলার প্রতিযোগিতা।

নীলগিরিতে দুপুরের আহার পর্ব সম্পন্ন করে সবাই এর সবুজ ও মেঘময় সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে ফিরতি পথ ধরেন। পথে তারা নেমে পড়েন বিখ্যাত ‘টাইটানিক ভিউ পয়েন্ট’-এ। প্রতিটি পাহাড়ের রূপ যেন একেক দিক থেকে একেক রকম সুন্দর। টাইটানিক ভিউ পয়েন্টে দঁাড়িয়ে জাহাজের মতো ভেসে থাকার অনুভূতি নিয়ে সবাই বেশ কিছু চমৎকার ছবি তোলেন।

ডাবল হ্যান্ড ভিউ পয়েন্ট ও চিম্বুক পাহাড় দর্শন :

এরপর গাড়ি থামে ‘ডাবল হ্যান্ড ভিউ পয়েন্ট’-এ। সেখানে দঁাড়িয়ে মনে হচ্ছিল মেঘের দেশে ঘুরে বেড়ানোর রোমাঞ্চকর অনুভূতি যেন বাস্তব রূপ নিয়েছে। দূর পাহাড়ের গায়ে মেঘের আনাগোনা দেখে সবাই অভিভূত হয়ে পড়েন। ডাবল হ্যান্ড ভিউ পয়েন্ট পেরিয়ে সফরসঙ্গীরা চলে আসেন বাংলার ব্ল্যাক ফরেস্ট খ্যাত ‘চিম্বুক পাহাড়’-এ। চিম্বুক পাহাড়ের সুউচ্চ চূড়া থেকে চারপাশের আদিগন্ত পাহাড় সারি দেখে প্রকৃতিপ্রেমী লেখকদের মনে নতুন কবিতার জন্ম নিচ্ছিল। চিম্বুকের সৌন্দর্য উপভোগ শেষে সবাই গাড়ি নিয়ে বিকেলে হোটেলে ফিরে আসেন।

হোটেল রুমে ফিরে কিছুটা বিশ্রামের পর মুহাম্মদ ফরিদ হাসান, মাইনুল ইসলাম মানিক, আরিফুল ইসলাম শান্তসহ কজন মিলে বান্দরবানের স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘মুন্ডি’ (এক প্রকার পাহাড়ি নুডলস/স্যুপ) খাওয়ার জন্য লোকাল মার্কেটে চলে যান। তারা তৃপ্তি সহকারে পাহাড়ি এই খাবারের স্বাদ গ্রহণ করেন।

ব্যাম্বু চিকেন ও রাতের সাংস্কৃতিক জলসা :

রাতের আহারের জন্য বেছে নেওয়া হয় হোটেল হিলভিউয়ের নিচের ক্যাফেটেরিয়া/ক্যান্টিন। সেখানে বান্দরবানের সবচেয়ে বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী বাঁশের ভেতর বিশেষ মশলায় তৈরি ‘ব্যাম্বু চিকেন’ এবং গরম গরম রুটি দিয়ে সবাই তৃপ্তির সাথে নৈশভোজ সম্পন্ন করেন।

খাবার শেষে শুরু হয় এই আনন্দ ভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ’সাহিত্য একাডেমি সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা’। হোটেল রুমে সমবেত হন সাহিত্য একাডেমির ছোট-বড় সকল সদস্য ও তাদের স্বজনেরা। আমাদের পরিচিত গুণী শিল্পীরা সুরের মূর্ছনায় পুরো ঘর মাতিয়ে তোলেন। শেখ মহিউদ্দিন রাসেল ভাই প্রারম্ভিক গান গেয়ে আড্ডার শুভ সূচনা করেন এবং দর্শকদের মাঝে এক অপূর্ব উৎসাহ তৈরি করেন।

এরপর মূল গানে লিড পজিশনে চলে আসেন কাজী রাসেল, আরিফুল ইসলাম শান্ত ও শাদমান শরীফ। তাদের অসাধারণ গায়কীতে ঘরে থাকা অন্য সদস্য ও শিশুরা নিচে নেমে নাচ ও আনন্দে মেতে ওঠে। গানে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সুরকে পূর্ণতা দেন মনি রুজ্জামান বাবলু, উজ্জ্বল হোসাইন, আরিফুল ইসলাম শান্ত ও ইয়াসিন দেওয়ান তবে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় শাদমান শরীফ কেনো অংশ নেয়নি সেটা অজানাই রয়ে গেলো। পাহাড়ি রাতের সেই গান, তাল ও আনন্দের রেশ সবার মনে এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি হয়ে খোদাই হয়ে যায়। এভাবেই শেষ হয় দ্বিতীয় দিনের আনন্দঘন সূচি।

ফিরতি যাত্রা, স্মৃতির ফ্রেমে বাঁধাই মুহূর্ত ও সমাপনী :

১ নভেম্বর, ভ্রমণের শেষ ও তৃতীয় দিন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী এবার নীল পাহাড়ের রাজ্য ছেড়ে স্বদেশের আঙিনা চঁাদপুরে ফেরার পালা। সকাল ১১টায় যাবতীয় ল্যাগেজ গুছিয়ে হোটেল হিলভিউকে বিদায় জানিয়ে বাসটি চঁাদের দেশের পথ ধরে চঁাদপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। পাহাড়ি পথ ছেড়ে সমতলের রাস্তায় নামার পর সবার মনেই ছিল এক অপূর্ব তৃপ্তি আর কিছুটা বিদায়ের বিষাদ।

ফিরতি পথে দুপুরের খাবারের জন্য বাসটি থামানো হয় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত বিখ্যাত ‘ভাবির হোটেল’-এ। ভাবির হোটেলের স্পেশাল গরুর মাংস এবং সতেজ টমেটোর সালাদ দিয়ে সবাই পরম তৃপ্তিতে দুপুরের খাবার খান। তবে খাবারের মূল আকর্ষণ ছিল ভাবির হোটেলের সুস্বাদু ও ঘন দধি এবং মিষ্টি, যা খাওয়ার পর বহুক্ষণ ধরে সবার মুখে তার অনন্য স্বাদ লেগে ছিল।

কুমিল্লায় যাত্রা বিরতি ও চাঁদপুরে প্রত্যাবর্তন :

সীতাকুণ্ড থেকে খেয়েদেয়ে বাস আবার চলতে শুরু করে। বিকালের দিকে বাস পৌঁছায় কুমিল্লায়। সেখানে সুপরিচিত ‘হোটেল নূরজাহান’-এ শেষবারের মতো যাত্রা বিরতি দেওয়া হয়। সেখানে হালকা নাস্তা ও চা-পানের পর বাস চূড়ান্ত গন্তব্য চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে চলতে শুরু করে। অবশেষে রাত ৮টায় বাসটি নিরাপদে এসে পৌঁছায় প্রিয় চাঁদপুর শহরে।

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ :

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি মাননীয় জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান, পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান, চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এএমএন জিয়াউল হিকমা, লায়ন মাহমুদ হাসান খান ওরফে নানা ভাই ভ্রমণে আমাদের টি শার্ট ও ক্যাপ উপহার দিয়ে ধন্য করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন ভ্রমণ উপ-কমিটির আহ্বায়ক মাইনুল ইসলাম, সদস্য সচিব জাহিদ নয়ন, সদস্য মুহাম্মদ হানিফ, ইমরান শাকির, আরিফুল ইসলাম শান্ত, ফরিদগঞ্জে থেকে অংশহন করেছেন ইয়াসিন দেওয়ান, হাজীগঞ্জের ভাই শাদমান শরীফসহ ভ্রমণে অংশগ্রহনকারী সকলের প্রতি যারা বিভিন্নভাবে আমাদের সহযোগিতা করেছেন।

সফরসঙ্গীদের নাম ও অনুভূতি :

এই স্মরণীয় ও সফল তিন দিনের আনন্দ ভ্রমণ দলে ছিলেন (জেষ্ঠতার ক্রমানুসারে নয়) মহাপরিচালক কাদের পলাশ ও তাঁর পরিবার (সহধর্মিণী জান্নাত আক্তার পুতুল, কন্যা তাসমিয়া জাহান কিমিয়া ও আয়মান জাহান ত্বাইর পুত্র জাহিন সুলতান), লায়ন মাহমুদ হাসান খান ও সহধর্মিণী মাহমুদা খানম , সহ-সভাপতি আবদুল্লাহ হিল কাফি, তাঁর পরিবার (সহধর্মিণী সুলতানা আক্তার ও কন্যা তাসফিয়া কাফী, নির্বাহী সদস্য সাদ আল-আমিন ও তাঁর পরিবার (সহধর্মিণী শামীমা আক্তার হেনা ও শালিকা নুসরাত হিমু), পরিচালক (গবেষণা) মুহাম্মদ ফরিদ হাসান, পরিচালক (প্রকাশনা) ও মাইনুল ইসলাম মানিক (আহ্বায়ক, আনন্দ ভ্রমণ উপ-কমিটি)

নির্বাহী সদস্য উজ্জ্বল হোসাইন ও তাঁর পরিবার (সহধর্মিণী নাসরিন আক্তার, পুত্র নওশাদ হোসেন নিহাল ও কন্যা নওশাবা মেহেরিন নাফিসা), মোখলেসুর রহমান ভূঁইয়া ও তাঁর পুত্র উমেদ আজহার ইয়ানূর ভূঁইয়া , মনিরুজ্জামান বাবলু ও তাঁর পরিবার (সহধর্মিণী ইশরাত জাহান ইভা, পুত্র আবরার ফাইয়াজ ও কন্যা ফাইজা ইনায়া) এবং শেখ মহীউদ্দিন রাসেল ও তাঁর পরিবার (সহধর্মিণী রোজিনা হাবিব, পুত্র শেখ আরিফ মহীউদ্দিন, কন্যা আমিনা বিনতে মহীউদ্দিন), সদস্য মুহাম্মদ হানিফ, কাজী রাসেল, জাহিদ নয়ন (সদস্য সচিব, ভ্রমণ উপ কমিটি), আরিফুল ইসলাম শান্ত, শাদমান শরীফ, সদস্য ইয়াসিন দেওয়ান, ইমরান শাকির ও নবাগত লেখক দীন মুহাম্মদ।

বাস থেকে নামার পর একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। মাত্র তিনটি দিনের এই নিবিড় সান্নিধ্য সবাইকে যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে ফেলেছিল। বিদায়বেলায় মনে হচ্ছিল, কতদিনের চেনা আপনজনেরা যেন বহু দূরে চলে যাচ্ছেন।

বিদায়লগ্নে সাহিত্য একাডেমির মান্যবর মহাপরিচালক কাদের পলাশ ভ্রমণের সার্বিক সফলতা প্রকাশ করেন। তিনি এত সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও আনন্দদায়ক একটি সফর উপহার দেওয়ার জন্য আনন্দ ভ্রমণ উপ-কমিটি, এর আহ্বায়ক মাইনুল ইসলাম মানিক, সদস্য সচিব জাহিদ নয়ন, সকল কর্মকর্তা, লেখক, শিল্পী ও তাদের পরিবারবর্গকে আন্তরিক শুভেচ্ছা, ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান।

তাঁর সংক্ষিপ্ত সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্তি ঘটে সাহিত্য একাডেমি চঁাদপুরের তিন দিনব্যাপী ঐতিহাসিক ও স্মরণীয় পাহাড়ি আনন্দ ভ্রমণের। বান্দরবানের সবুজ পাহাড়, মেঘের ভেলা, পাহাড়ি ঝরনা, সুরের আড্ডা আর পারস্পরিক ভালোবাসার এই স্মৃতি চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমির ইতিহাসে এক উজ্জ্বল ও চিরভাস্বর অধ্যায় হয়ে থাকবে।

সম্পর্কিত খবর