হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ ওয়াকফ এস্টেট নিয়ে অপপ্রচারের অভিযোগ

হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ ও আহমাদ আলী পাটওয়ারী ওয়াকফ এস্টেটের সুনাম ক্ষুণ্ন এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি চক্র সংবাদ সম্মেলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম ব্যবহার করে অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন এস্টেটের মোতওয়াল্লী প্রিন্স শাকিল আহমেদ। সম্প্রতি দৈনিক চাঁদপুর খবরের সম্পাদক/প্রকাশকের কাছে পাঠানো এক লিখিত বক্তব্যে তিনি এ অভিযোগ করেন।

লিখিত বক্তব্যে এস্টেটের বিভিন্ন কার্যক্রম, চলমান মামলা এবং কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিরোধের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। লিখিত বক্তব্যে প্রিন্স শাকিল আহমেদ দাবি করেন, আহমাদ আলী পাটওয়ারী ওয়াকফ এস্টেটের সম্পদ ও স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে মোতওয়াল্লী পরিবার বিভিন্ন সময় হয়রানি ও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। এস্টেটের সঙ্গে কয়েকজন ঠিকাদার ও ব্যক্তির মামলা চলমান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আদালতের মাধ্যমে যেসব বিষয় নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে, সেগুলো নিয়ে রায় হওয়ার আগেই বিভিন্ন মাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

ঠিকাদার কবির হোসেন লিটনকে ঘিরে অভিযোগ : চিঠিতে মো. কবির হোসেন লিটনের বিষয়ে বলা হয়, তিনি ২০২২ সালের দিকে এস্টেটে সর্বশেষ ঠিকাদারি কাজ করেন। তার বিরুদ্ধে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০ ধারায় অপরাধের সত্যতা পাওয়ার দাবি করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে চাঁদপুর আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন বক্তব্য দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে চিঠিতে।

৩৮ লাখ টাকার পরিবর্তে দেড় কোটি টাকা দাবির অভিযোগ : আজাদ রহমান মাসুদ মজুমদার সম্পর্কে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, নির্মাণাধীন মার্কেটের তিনটি কক্ষের জন্য তিনি ৩৮ লাখ টাকা জমা দেন। পরবর্তীতে কক্ষের ভাড়াটিয়া হওয়ার আগে অর্থ পরিশোধ না করে দোকান হস্তান্তরের অভিযোগ করা হয়েছে।

চিঠিতে আরও দাবি করা হয়, পরবর্তীতে তিনি জমাকৃত ৩৮ লাখ টাকার পরিবর্তে এস্টেটের কাছে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

কবরস্থানের জমি নিয়ে বিরোধ : মোহাম্মদ আলাল হোসেনের বিষয়ে চিঠিতে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত একটি কবরস্থানের জায়গার ওপর তিনি মালিকানা দাবি করেছেন। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে এবং এর মধ্যে একাধিকবার জায়গাটি দখলের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

হিসাবরক্ষকের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ : মো. শাহ আলমকে ওয়াকফ এস্টেটের হিসাবরক্ষক উল্লেখ করে লিখিত বক্তব্যে তার বিরুদ্ধে ঠিকাদার ও কর্মীদের সঙ্গে যোগসাজশ করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রায় ১০ বছর আগের একটি ব্যক্তিগত চেকে বর্তমানে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা লিখে ব্যাংকে জমা দেওয়ার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও চিঠিতে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনায় ঠিকাদার কবির হোসেন লিটনের মাধ্যমে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস (এনআই) আইনে মামলা করার অভিযোগও করা হয়েছে।

ঠিকাদার মিজান ব্যাপারীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ : মো. মিজান ব্যাপারীকে এস্টেটের ঠিকাদার উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, ২০২২ সালের কাজের হিসাব বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য তাকে একাধিকবার মৌখিকভাবে বলা হয়। পরে ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর এবং ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তাকে নোটিশ ও উকিল নোটিশ দেওয়া হয়। তবে এখনো কাজের হিসাব বুঝিয়ে না দিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন এবং অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
১ দশমিক ১৯ একর থেকে ৯ দশমিক ৭০ একর : লিখিত বক্তব্যে ওয়াকফ এস্টেটের উন্নয়ন কার্যক্রমেরও বিস্তারিত তুলে ধরেন মোতওয়াল্লী প্রিন্স শাকিল আহমেদ।

তিনি বলেন, ওয়াকিফ মোতওয়াল্লী আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) ১ দশমিক ১৯ একর সম্পত্তি দিয়ে ওয়াকফ এস্টেটের যাত্রা শুরু করেন। পরবর্তীতে দায়িত্ব পালনকারী তিনজন মোতওয়াল্লীর সময়ে সম্পত্তির পরিমাণ বেড়ে ৯ দশমিক ৭০ একরে উন্নীত হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

চিঠিতে বলা হয়েছে, হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদের উন্নয়ন, আহমাদিয়া কামিল মাদ্রাসা, জামিয়া আহমাদিয়া কওমি মাদ্রাসা, হযরত মুনিরুদ্দিন মনাই হাজী (রহ.) হাফেজিয়া মাদ্রাসা এবং মুনিরিয়া নূরানী মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় ওয়াকফ এস্টেট ও মোতওয়াল্লী পরিবারের ভূমিকা রয়েছে।

কয়েকটি মার্কেট ও কর্মসংস্থান প্রকল্প : এস্টেটের উদ্যোগে হাজীগঞ্জ প্লাজা মার্কেট, হাজীগঞ্জ টাওয়ার মার্কেট, কওমি মাদ্রাসা মার্কেট, রজনীগন্ধা মার্কেট, রজনীগন্ধা এক্সটেনশন এবং হযরত মকিমউদ্দিন শপিং সেন্টারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

মোতওয়াল্লীর অভিযোগ, নির্মাণাধীন প্রকল্পের কাজে হিসাবরক্ষক, ঠিকাদার ও প্রকৌশলীর মধ্যে যোগসাজশের কারণে বিপুল পরিমাণ অর্থের অনিয়ম হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে মামলা হিসেবে বিচারাধীন রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিক্রির দাবি : চিঠিতে আরও বলা হয়, হযরত মকিমউদ্দিন শপিং সেন্টারের নির্মাণকাজ এগিয়ে নিতে ইসলামী ব্যাংক থেকে দুই পর্যায়ে মোট ৮ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। কোভিড-১৯ পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মার্কেটের অনেক বরাদ্দগ্রহীতা টাকা ফেরত চাওয়ায় এস্টেট আর্থিক সংকটে পড়ে বলে দাবি করা হয়েছে।

এস্টেটের অর্থের সংকটের কারণে হাসপাতালের অর্থও মসজিদ ভবনের কাজে ব্যয় করতে হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে হাসপাতালের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা চলমান রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

মোতওয়াল্লী প্রিন্স শাকিল আহমেদ দাবি করেন, ব্যাংক ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিক্রি করতে হয়েছে এবং প্রায় ৫ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। বর্তমানে তাদের বসতবাড়িও ব্যাংকে বন্ধক রয়েছে বলে তিনি জানান।
সুনাম রক্ষায় সহযোগিতা চাওয়া : লিখিত বক্তব্যের শেষাংশে প্রিন্স শাকিল আহমেদ বলেন, হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ ও আহমাদ আলী পাটওয়ারী ওয়াকফ এস্টেট দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয়, শিক্ষা ও সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে অপপ্রচার চালানো হলে তা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।

তিনি ওয়াকফ এস্টেটের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগের বিষয় আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিষ্পত্তির আহ্বান জানান। একই সঙ্গে এস্টেট ও মোতওয়াল্লী পরিবারের সুনাম রক্ষায় গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন। তবে লিখিত বক্তব্যে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও পক্ষগুলোর বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। আদালতে বিচারাধীন বিষয়গুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলে প্রকৃত তথ্য ও দায়-দায়িত্ব নির্ধারিত হবে।

সম্পর্কিত খবর