
মহসিন হোসাইন : জনবান্ধব, স্বচ্ছ জবাবদিহিতা, নিরপেক্ষ ও দক্ষ প্রসাশন এই প্রতিপাদ্য নিয়ে চাঁদপুর জেলার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও সরকারি কর্মকর্তাগণের সাথে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সম্মানিত সদস্যগণের মতবিনিময় সভা সম্পন্ন হয়েছে।
সভায় সভাপতির বক্তব্য রাখেন- সংস্কার কমিশন সদস্য ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া। তিনি বলেন, জনপ্রশাসন সংস্কারের যে বিষয়টি রয়েছে, আমার কাছে মনে হয় চাঁদপুরের মানুষ এই বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এই জন্য আমার কাছে এটা খুব ভালো লেগেছে। আমরা কেউ কারো গোলাম না। সবাই সবার জায়গা থেকে আমরা স্বাধীন। আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের ভাই, প্রত্যেকে প্রত্যেকের বন্ধু, প্রত্যেকে প্রত্যেকের সহায়ক এবং যারা সরকারি কর্মচারী তারা সবাই সেবক, গোলাম নয়।
মঙ্গলবার( ৭ জানুয়ারি) সকাল ১০টায় চাঁদপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সম্মেলন কক্ষে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরো বলেন, সবাই আমরা আমাদের নিজেদেরকে আগে সংস্কার করতে হবে। আমরা সবাই সবার যার যার অবস্থান থেকে নিজেকে সংস্কার করি। এবং সেটাকে আপনারা রোল মডেল হিসেবে চাঁদপুর’কে প্রতিষ্ঠা করেন। এসময় তিনি চাঁদপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন এর ভূয়সি প্রশংসা করে বলেন, হি-ইজ ডায়নামিক। বর্তমান চাঁদপুরে বালু মহালে জেলা প্রশাসক শতাধিক আসামী গ্রেফতার এবং ১৮ টি মামলা করেছেন। চাঁদপুরে সকল কাজ কর্ম’কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সহ বিশেষ ভূমিকা পালন করছেন জেনে, তিনি যথেষ্ট প্রশংসা করেন জেলা প্রশাসকের।
তিনি উপস্থিত সকলকে বলেন, চাঁদপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন এর নেতৃত্বে আগে নিজেদের মধ্যে সংস্কার আনার কথা বলেন। এছাড়াও তিনি বলেন, সবকিছু কিন্তু আইনকানুন এবং কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মাইন্ড সেটআপ এবং আচরণটাই হলো গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, আমাদের যারা সরকারি প্রসাশনের কর্মকর্তা আছেন, তাদের দরজা সব সময় তৃণমূল বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য খোলা রাখতে হবে। এছাড়াও সাধারণ মানুষ যেন খুব শর্টকাট আপনার কাছে সেবার জন্য আসতে পারে, সে ব্যাবস্থা করে রাখতে হবে। প্রশাসন হতে হবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। আইনের বাইরে যেন কেউ কিছু না করাতে পারে। রাষ্ট্রের মেশিন হিসেবে কাজ করতে হবে। আমরা আশাকরি চাঁদপুর থেকেই সেই বিপ্লব শুরু হোক। এই বলে তিনি তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষ করেন।
এদিকে সংস্কার কমিশনের অন্য এক সদস্য ড. মোঃ হাফিজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলেই আজকে আমরা এখানে। তাঁদের অবদান ভুলার মতো নয়। তিনি বলেন, একসময় ব্রিটিশরা আমাদের কাছ থেকে নিয়েছেন, এরপর পাকিস্তান আর এখন নিজের দেশের মানুষই আমাদের দেশের অর্থ লুটপাট করে নিয়ে যাচ্ছেন বাইরের দেশে। আমরা ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী সরকারের সময় শুনতে পেয়েছি একজন ১০ হাজার কোটি টাকার মালিক, আরেকজন হাজার কোটি টাকার মালিক। এই অবৈধ অর্থ আবার দেশ থেকে বিদেশেও পাচার করা হয়েছে। এগুলো থেকে কিভাবে নিজেদেরকে সংস্কার করা যায় সে বিষয়ে তাগিদ দেন তিনি।
সংস্কার কমিশনের সদস্য ও বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, আসলে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন আমাদেরকে অনেক বেশি সজাগ করেছে, অনেক বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছে।
তিনি বলেন, আমার কেন আজকে এখানে আসতে হলো, আমি কি আজ এখানে বসে থাকার কথা ছিল। আমি তো এখানে থাকার কথা ছিলনা।আমার তো থাকার কথা ছিল ক্লাসে। আমি ২০২২ সালের মার্চ মাসে গ্রেফতার হই। আমি একজন ছাত্র, এটাই আমার দোষ। আমি দেখেছি তারা কিভাবে নির্যাতন করছে, কি আচরণটা করেছে।
যারা অভিভাবক ছিলো, তারা অভিভাবকত্বের দায়িত্ব পালন করতে পারেন নাই বলেই আমাদেরকে দায়িত্ব নিতে হয়েছে। তাই আজকে এখানে আসতে হয়েছে। চাঁদপুরের সাবেক ডিসি অঞ্জনা খান মজলিশ যখন বদলি হয়, তখন কেউ তার সততার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন কিনা। আপনারা কেউ দাঁড়াননি। আপনারা কেউ মানববন্ধনও করেননি।
এতো গুলো সরকারি কর্মকর্তা চাঁদপুরে বিভিন্ন দফতরের ছিলেন, কেউ এগিয়ে আসেননি। তখন নিজেরা নিজেদের চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। আজকে তো শতাধিক লোক এখানে এসেছেন, সেদিন কি কোনো শিক্ষক এসেছিলেন। কিন্তু ঠিক-ই তখন শেখ হাসিনার দালালি করার জন্য পিছন পিছন ঘুরে ছিলেন। অথচ আজকে আপনাদের একজন শিক্ষকের ৭১ হাজার টাকা বেতনে হচ্ছেনা এটা ঠিক-ই বলতে পারছেন, কিন্তু একজন কৃষক দিনরাত পরিশ্রম করেও ১০ হাজার টাকা মাসে পাচ্ছেনা। তারা কিভাবে চলে।
তিনি আরো বলেন, বয়স চব্বিশ হতে পারে, কিন্তু ম্যাচিউরিটি আপনাদের চাইতেও কোনো অংশে কম নয়, তবে দালাল না। এখন যা হওয়ার হয়ে গেছে, অনেক মানুষ নিহত হয়েছেন, অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। আমরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। এখন সবাই মিলে কিভাবে আরো সুন্দর ভাবে নিজেদেরকে সংস্কার করা যায়, কিভাবে দেশটাকে উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাওয়া যায়, সে বিষয়ে আগাতে হবে।
আপনার সততা, দক্ষতা আছে, আপনি একজন এদেশের নাগরিক, আপনি একজন কর্মকর্তা, আপনার দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো আপনি এই দেশের নাগরিকদের সেবা দিবেন, এটা আপনার দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে, এটা আমার রেগুলার ডিউটি, এটি বড় করে দেখার কিছু নেই।
এছাড়াও তিনি বলেন, একজন শিক্ষক নৈতিকতার কথা বলবে এটা তার রেগুলার ডিউটি। এখানে স্রোতের বিপরীতে যাওয়ার কিছু নেই। আপনাদেরকে যদি কোনো এমপি এসে চাপ প্রয়োগ করে বলে, কোনো সচিব বলে, বা কোনো আমলা এসে বলে আমার কাজটা করে দিন, আপনি কখনোই নেগোসিয়েশনে যাবেন না, এটা ভালোভাবে মনে রাখবেন।
আপনারা ন্যায়ের পক্ষে কথা বলেন, অন্যায় অবিচার থেকে সরে আসুন, সাধারণ মানুষকে সেবা দিতে, দেশটাকে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছে দিতে আমাদের সঙ্গে একসাথে কাজ করুন।
এর আগে চাঁদপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন এর সঞ্চালনায় সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- চাঁদপুর জেলা পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব পিপিএম, সিভিল সার্জন ডাঃ মোঃ নূরে আলম দীন, চাঁদপুর সদর হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ একেএম মাহবুবুর রহমান,বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মুজিবুর রহমান,বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজি হাসেম,জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড: সলিমুল্লাহ সেলিম,জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অ্যাড: শাহজাহান মিয়া,চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজ প্রফেসর ড. মোঃ ইকবাল রহমান,চাঁদপুর পুরান বাজার ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) শোয়াইব,
প্রেসক্লাবের সভাপতি রহিম বাদশা,জেলা তথ্য কর্মকর্তা মোঃ তপন বেপারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জেলা সাধারণ সম্পাদক মোঃ হাবিবুর রহমান, চাঁদপুর উইমেন্স চেম্বার অফ কমার্সের সভাপতি মুনিরা আক্তার, হেফাজত ইসলামের জেলা সাধারণ সম্পাদক মুফতি মাহবুবুর রহমান, জেলা গন অধিকার পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ জাকির হোসেন, ইসলামী আন্দোলন চাঁদপুর জেলা সভাপতি জয়নাল আবেদীন,এখন টিভির চাঁদপুর জেলা প্রতিনিধি তালহা জুবায়ের।
শুরুতেই বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় যেসকল শিক্ষার্থী আহত ও নিহত হয়েছে তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং বক্তব্যে বক্তারা জনপ্রশাসন সংস্কারের চারটি বিষয়ে জনবান্ধব, স্বচ্ছ জবাবদিহিতা, নিরপেক্ষ ও দক্ষ প্রসাশন নিয়ে আলোচনা করে বলেন, গত পনের বছরে এমনও কর্মকর্তা রয়েছেন কোনো এক সময় যার চাকরির শুরু ছিল চাঁদপুরে, চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সেই চাঁদপুরেই কাটিয়েছেন।
সারাদেশে এমন বহু কর্মকর্তা, কর্মচারীরা রয়েছেন। যারা কিনা চাকরি হওয়ার পর আর দ্বিতীয়বার কখনো পদায়ন হননি অন্য কোথাও। বিশেষ করে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসে, নির্বাহীর পরের পদে থাকা ব্যক্তিরা, উপজেলা চেয়ারম্যান এর সিএ, যারা কিনা ১৫-২০ বছর একই পদে একজায়গায় দাড়িয়ে চাকরি জীবনের ইতি টানতে যাচ্ছেন।
এছাড়াও ভূমি অফিস,ডিসি অফিস, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় সরকার বিভাগের পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ সচিব পদ, অফিস কর্মকর্তা থেকে শুরু করে অফিস পিয়ন সকলেই সুযোগ নিয়ে চাকরি করছেন বছরের পর বছর। কিন্তু বদলি হয়নি একবারের জন্যও।
তাই বক্তারা সভায় উত্থাপন করেন, প্রতি তিন বছর পর পর হলেও এদেরকে বদলির ব্যাবস্থা করলে জনপ্রশাসন সংস্কারের হবে বলে আশা করা যায়। তবে তার আগে নিজেরা নিজেদেরকে বদলাতে হবে, নিজেদের মন মানসিকতা চেঞ্জ করতে হবে, নিজের মধ্যে পরিবর্তন না আনলে কখনোই রাষ্ট্র বা দফতর সংস্কার করা সম্ভব নয়।
তাই রাষ্ট্র ও সমাজ এবং দফতর সংস্কার করতে হলে আগে নিজেরা নিজেকে সংস্কার করতে হবে বলে মতামত ব্যাক্ত করেন তারা।
এসময় উপস্থিত ছিলেন- চাঁদপুর জেলা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক মোস্তাফিজুর রহমান, চাঁদপুর জেলা পরিষদ নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মনোয়ার হোসেন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট একরামুল ছিদ্দিক,নারী বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ সৈয়দা বদরুন্নাহার চৌধুরী,চাঁদপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ একেএম আবদুল মাননান, সমাজসেবা অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোঃ নজরুল ইসলাম,
চাঁদপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম,চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কাদের পলাশ, চাঁদপুর জেলা চেম্বার অফ কমার্সের পরিচালক তমাল ঘোষ, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফাতেমা মেহের ইয়াসমিন, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ মেহেদী হাসান সহ অন্যান্য কর্মকর্তাগণ এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ।




