মেঘনায় বালুমহাল সীমানা নিয়ে চাঁদপুর- মুন্সিগঞ্জে মতানৈক্য : সংঘর্ষের আশঙ্কা

স্টাফ রিপোর্টার : মেঘনা নদীর বালুমহালকে কেন্দ্র করে মুন্সিগঞ্জ ও চাঁদপুর জেলার মধ্যে মেঘনা নদীর সীমানা বিরোধ যেকোন সময় ভয়াবহ রূপ ধারণ করার শঙ্কা রয়েছে।

প্রশাসন কর্তৃক বালুমহালের সঠিক সীমানা নির্ধারণ কিংবা চিহ্নিত করে না দেয়ায় প্রায়শই উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে, যা ইজারাগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানসহ বালু উত্তোলনকারী ও সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর মধ্যে দাঙ্গা-সংঘর্ষে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা বিরাজ করছে। জানা গেছে, জেলা প্রশাসন মুন্সিগঞ্জ কর্তৃক বাংলা ১৪৩২ সনের জন্য সদর উপজেলার ভাষানচর বালুমহাল (১২০ একর) টি মেসার্স মনির এন্টারপ্রাইজ এর নামে ইজারা দেয়া হয়।

গত ২২ মে থেকে প্রতিষ্ঠানটি ড্রেজার ও বাল্কহেডের মাধ্যমে বালু উত্তোলন শুরু করে। তবে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইজারার বৈধতা দেখিয়ে তারা আন্তঃজেলা জলসীমা অতিক্রম করে চাঁদপুর মতলব উত্তর উপজেলার সীমানা থেকে বালু উত্তোলনের চেষ্টা করে থাকে। যেহেতু চাঁদপুর মতলব উত্তরে বৈধ কোন বালু মহাল নেই, সেহেতু আন্তজেলা জলসীমা অতিক্রম করে মতলব উত্তর জলসীমায় প্রবেশ করত বালু উত্তোলনের অপরাধে মোহনপুর নৌ পুলিশ কর্তৃক প্রায় গত ৩ মাসে ৮টি ড্রেজার ও ৪৫টি বাল্কহেড জব্দ করত নিয়মিত মামলা দায়ের করেছে বলে জানা যায়।

মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার ভাষানচর বালুমহাল ও তৎসংলগ্ন নদীতে বালু উত্তোলনকারী ও কালিরচর-চর আবদুল্লাহপুরের গ্রাম বাসীদের মধ্যে গত ১৯ আগস্ট সংঘর্ষের ঘটনায় কালিরচরের রিপন (৩২) ও শামিম (১৫) আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, ইজারাগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করেছে, কিন্তু অদ্যাবধি ইজারাগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের নিকট বালুমহালের সুনির্দিষ্ট চৌহদ্দি ঠিক করে না দেয়ায় তারা বেপরোয়াভাবে বালু উত্তোলন করার চেষ্টা করছে এবং বালু উত্তোলনকারীরা নিরীহ গ্রামবাসীদেরকে বিভিন্ন ধরনের ভীতি প্রদর্শন করছে।

সরেজমিনে পরিদর্শনে জানা যায়-মুন্সিগঞ্জ ও চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের যৌথ পরিদর্শনে সীমানা নির্ধারণে মতবিরোধ সৃষ্টি হওয়ায় আন্তঃজেলা নদী সীমানাসহ বালুমহালের সীমানা নির্ধারনের বিষয়টি অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ইজারাদারপক্ষ মেঘনা নদীর মধ্যবর্তী পর্যন্ত ইজারার অংশ দাবী করে আসছে। ফলে সুযোগ পেলেই ইজারাগ্রহীতার লোকজন বিরোধপূর্ণ মেঘনা নদীর সীমানাসহ আশপাশের এলাকায় প্রবেশ করে বালু উত্তোলনের চেষ্টা করছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ ছাড়া এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

চলতি বর্ষা মৌসুমে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে মেঘনা নদীর নিজ অধিক্ষেত্রসহ আন্তঃজেলা ঝুঁকিপূর্ণ ও বিরোধীয় জলসীমায় মোহনপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ি দিনরাত স্পিডবোটের মাধ্যমে নৌ টহল পরিচালনা করছে, স্থানীয় জনসাধারণের সাথে উঠান বৈঠক করছে যা সত্যিই প্রশংসার দাবীদার। মোহনপুর নৌ পুলিশের সাথে যদি যৌথভাবে কোষ্টগাডসহ অন্যান্য বাহিনী যৌথ টহল ডিউটি করে, তবে বালু উত্তোলনকারীদের বেপরোয়াভাব সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে স্থানীয়রা মত প্রকাশ করেন।

শুধু ভাষানচর নয়, মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার মধ্য চরমজানবেগ বালুমহাল (১৫০ একর) ও গজারিয়া উপজেলার চরকালীপুর বালুমহালেও একই ধরনের সীমানা জটিলতা রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড ও জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সুনির্দিষ্টভাবে সীমানা নির্ধারণ করে দৃশ্যমান বয়া স্থাপন এবং ইজারাগ্রহীতা পক্ষকে পরিস্কারভাবে বুঝিয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

অতিদ্রুত মুন্সিগঞ্জ ও চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে আন্তঃজেলা মেঘনা নদীর সীমানা নির্ধারণ না হলে মেঘনায় বালুমহাল বিরোধ থেকে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঝুঁকি রয়েছে। বর্তমানে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও ভবিষ্যতে নিয়ম মেনে বালু উত্তোলন না করলে পরিস্থিতি যে কোন সময় অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে বলে স্থানীয়রা আশঙ্কা প্রকাশ করছে। এ প্রসঙ্গে মোহনপুর নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি ইনচার্জ পরিদর্শক মোহাম্মদ আলী জানান, মেঘনা নদীর বালুমহালকে কেন্দ্র করে আন্তঃজেলা জল-সীমানায় উদ্ভুত জটিলতার বিষয়ে মোহনপুর নৌ পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

নিয়ম বহির্ভূতভাবে কেউ যাতে বালু উত্তোলন করতে না পারে সেজন্য নৌ পুলিশ দিনরাত নিরবিচ্ছিন্নভাবে নৌ টহল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ জলসীমায় ৮টি ড্রেজার ও ৪৫টি বাল্কহেড জব্দ করে নিয়মিত মামলা রুজু করা হয়েছে।

মোহনপুর নৌ পুলিশ আইন ও বিধির মধ্যে থেকে ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের দিক নির্দেশনার আলোকে সংশ্লিষ্ট জলসীমায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সচেষ্ট। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মোতাবেক যৌথভাবে আন্তজেলা জল-সীমানা নির্ধারণ হলে উদ্ভুত সীমানা জটিলতার স্থায়ী সমাধান হবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে।

মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, মুন্সিগঞ্জ ও চাঁদপুর জেলার মধ্যে মেঘনা নদীর সীমানা বিরোধ নিষ্পতি করার লক্ষে ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ২টি চিঠি ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে।

যা এখনও নিষ্পতি হয়নি। জরিপ অধিদপ্তর বিষয়টি সমাধান করে দিলে সহজেই সমাধান হবে। শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে শীঘ্রই চাঁদপুর-মুন্সিগঞ্জ জেলার জেলা প্রশাসক ও ইজারাদারদের নিয়ে বসবেন।

সম্পর্কিত খবর