
স্টাফ রিপোর্টার: দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়ে স্বপ্ন ছিল ভালো একটি চাকরি আর সচ্ছল জীবন যাপন করা। কিন্তু সেই স্বপ্নই এখন ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার ১৫টি পরিবারের।
জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার ৪নং সুবিদপুর ইউনিয়নের ঘড়িহানা গ্রামের মৃত আবু তাহের তালুকদারের ছেলে ওমান প্রবাসী প্রতারক সাদ্দাম হোসেন ও তার ভাই মোহাম্মদ ইউসুফ বিদেশে ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে দুই লক্ষ টাকা করে সর্বমোট ৩০ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
অনেকেই শেষ সম্বল বিক্রি করে, জমি বন্ধক রেখে, এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়েছেন সোনালি ভবিষ্যতের আশায়। আর এই সবগুলো টাকাই হাতিয়ে নিয়েছেন সহজ-সরল মনির হোসেনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে।
এলাকার লোকজন মনিরের মাধ্যমে প্রতারক সাদ্দামকে টাকা দিলেও এখন সেই টাকা পরিশোধ করতে মনির হোসেনকেই চাপ দিচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। আর মানুষের টাকা প্রতারকদের দিয়ে এখন ঘর-বাড়ি ছাড়া হয়েছেন মনির হোসেন নিজেই।
বর্তমানে সব কিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তিনি। মাথা গোজার ঠাঁই বসত ভিটাটুকুও বন্ধক রেখে প্রতারক চক্রকে দেওয়া টাকা পরিশোধ করতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন মনির।
তবে এ বিষয়ে প্রতারক চক্রটির বিরুদ্ধে চাঁদপুর আদালতে একটি মামলা দিয়েছেন ভুক্তভোগীদের পক্ষে মনির হোসেন। যার নং, সিআর ৩৪০। উক্ত মামলার আসামী প্রতারক সাদ্দাম হোসেন ও তার ভাই মোহাম্মদ ইউসুফের নামে গ্রেফতারী ওয়ারেন্ট জারি হলেও এখনো ধরাছোঁয়ার বাহিরে প্রতারকরা।
মামলা করেও প্রতারক চক্রটিকে আইনের আওয়াতায় আনতে না পেরে চাঁদপুরের পিবিআই, ফরিদগঞ্জ সেনাবাহিনী ক্যাম্প, ফরিদগঞ্জ থানা, মানবাধিকার সংস্থা ও প্রতারকদের স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোন প্রতিকার পায়নি মনির হোসেন। প্রতারক চক্রটির কাছ থেকে টাকা উদ্ধার করতে এখন বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিচ্ছেন তিনি।
জানা যায়, মতলব দক্ষিণ উপজেলার ৩নং খাদেরগাঁও ইউনিয়নের ঘিলাতলী গ্রামের মৃত আঃ সাত্তারের ছেলে মনির হোসেনের সাথে ফেসবুকে পরিচয় হয় একই জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার মৃত আবু তাহের তালুকদারের ছেলে ওমান প্রবাসী প্রতারক সাদ্দাম হোসেনের।
দীর্ঘ কয়েক মাস মোবাইল ফোনে বন্ধুত্বের ছলে কথা হয় দুই জনের। বন্ধুত্বের দূর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সাদ্দাম হোসেন ওমানে আল সাফা কোম্পানীতে সেলসম্যান পদে চাকুরির জন্য বেশ কিছু লোক লাগবে বলে প্রলোভন দেয় মনির হোসেনকে।
সহজ-সরল মনির হোসেন প্রতারক সাদ্দাম হোসেনের কথা বিশ্বাস করে নিজের এবং আত্মীয়-স্বজনসহ মোট ১৫ জনের পাসপোর্টের কপি ও জনপ্রতি ২ লাখ টাকা করে সাদ্দামের দেওয়া ব্যাংক একাউন্ট, বিকাশ, নগদ ক্যাশসহ বিভিন্ন মাধ্যমে মোট ৩০ লক্ষ টাকা প্রতারক সাদ্দামকে প্রদান করেন।
এদিকে মনির হোসেনের বিশ্বাস অর্জনের জন্য টাকা দেওয়ার আগেই সাদ্দাম হোসেন ১৫টি পাসপোর্টের বিপরীতে কম্পিউটার সফটওয়ারের মাধ্যমে ১৫ জনের নামেই ভুয়া ভিসার কপি মনির হোসেনের কাছে পাঠায়। পরে মনির তাকে বিশ্বাস করে টাকা লেনদেন শুরু করেন।
১৫টি ভিসা বাবদ মনিরের কাছ থেকে সাদ্দাম হোসেন ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া শেষে মনির হোসেনের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। পাশাপাশি মনিরের ফেসবুক, ম্যান্সেজার, মোবাইল নম্বর ব্লক করে দিলে মনির হোসেন বুঝতে পারেন তিনি প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়েছেন। তখন মনির মোবাইল নাম্বার এবং ব্যাংক একাউন্টের সূত্র ধরে জানতে পারেন বন্ধুত্বের ছলে ওমানের ভিসা দেওয়াটা ছিল ভূয়া, টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল এবং প্রতারণা।
ভুক্তভোগী মনির হোসেন জানান, ওমানের আল সাফা কোম্পানিতে ভালো বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে আমার কাছ থেকে আমার পাসপোর্ট সহ মোট ১৫টি পাসপোর্ট নেয় সাদ্দাম হোসেন। এর পর ভূয়া ভিসা দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে তার ভাই মোহাম্মদ ইউসুফ এবং ব্যাংক একাউন্টসহ বিভিন্ন মাধ্যমে আমার কাছ থেকে সর্বমোট ৩০ লাখ টাকা নেওয়ার পর সাদ্দাম হোসেন আমার সাথে হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
এরপর আমার ফেসবুক, ম্যান্সেজার, ইমু, মোবাইল নম্বর ব্লক করে দেয়। পরে খোঁজ নিয়ে সাদ্দামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি এবং তার পরিবারের কেউ আমাকে পাত্তা দেয়নি।
ভুক্তভোগী মনির আরও জানান, আমি মানুষের টাকা প্রতারকদের দিয়ে আমি ঘর-বাড়ি ছাড়া হয়েছি। আমি বর্তমানে নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছি। আমার মাথা গোজার ঠাঁই বসত ভিটা বন্ধক রেখেও মানুষের টাকা শোধ করতে পাচ্ছি না।
এ বিষয়ে প্রতারক সাদ্দাম হোসেনের ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বারে (০১৭৭২৩৪৭৯২১) যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এদিকে অপর প্রতারক ইউসুফ জানান, গত ২/৩ বছর ধরে মনির হোসেন আমাদেরকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করে আসছে। তারা আদালতে গেছে, যদি স্বাক্ষী প্রমাণ করতে পারে, আদালত যে সিদ্ধান্ত দিবে আমরা সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিবো। টাকা নিয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ইউসুফ বলেন, আমরা তার কাছ থেকে কোন টাকা নেইনি। তার সাথে আমার এলাকার কিছু লোক আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
মনির হোসেনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সাগর সরকার বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে সমন জারি হওয়ার পর ওয়ারেন্ট জারি হয়েছে। বর্তমানে আসামিরা পলাতক রয়েছে।ভুক্তভোগী মনির হোসেন ব্যাংকের মাধ্যমে আসামীদেরকে যে টাকা দিয়েছে সেগুলো যাচাই বাছাই করে পিবিআই আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। আসামিরা আটক হলে ভুক্তভোগী মনির হোসেন তার টাকা ফেরত পাবে।
টাকা উদ্ধারে প্রতারক চক্রটিকে সনাক্ত করে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন মনির হোসেনসহ ১৫টি ভুক্তভোগী পরিবার।




