ফরিদগঞ্জে আ’লীগ কর্মীর হাতে হামলার শিকার বিএনপি কর্মী!

ফরিদগঞ্জ প্রতিনিধি : চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে ঠুনকো ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর জন্য সব ব্যবস্থা করেছে শাওন গং।

অভিযোগ রয়েছে নিজের মাথা নিজেরা কেটে প্রতিপক্ষ আজিমকে ফাঁসানেরা অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে এলাকার চিহ্নত মাদক সেবীর দল। এ যেন নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করা।

ঘটনার বিবরনে জানা যায়, উপজেলার ১৫নং রূপসা উত্তর ইউনিয়নের ঘোড়াশালা গ্রামের মাইজ বাড়িতে রাস্তা ব্যবহারকে কেন্দ্র করে একই বাড়ির শাওন গং এবং আজিম গংদের মধ্যে মারামারি হয়।

গত বৃহস্পতিবার (২৬ জুন ২০২৫) আনুমানিক সকাল ১১ টায় মানিক ও শাওন তারা দুই ভাই গাড়িতে মালামাল আনার সময় একই বাড়ির আব্দুর রবের ছেলে আজিম (২৭) তাদের কাছে রাস্তা সংস্কারের জন্য জন্য ১ হাজার টাকা দাবি করে। শুধু তার কাছেই নয়, ঐ রাস্তাটি সংস্কারের জন্য আজিম দায়িত্ব নিয়ে অনেকের কাছে সহযোগিতা চেয়েছে। কিন্তু বিষয়টিকে চাঁদা দাবি করা হয়েছে মর্মে একই বাড়ির মৃত আব্দুল মতিনের ছেলে শাওন (৩১) ও মানিক (২৪), আজিম এবং তার ছোট ভাই আরাফাত (২৪) এর সাথে বাকবিতন্ডায় ঝড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে ঝগড়া ও মারামারির ঘটনা ঘটে।

দুর্বল শরীরের আজিম যথেষ্ট মার খেয়ে ঐদিনেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সএ ভর্তি হয়। ২৭ ও ২৮ তারিখে কোর্ট বন্ধ থাকায় ২৯ জুন রোববার মো. আজিম, পিতা- আবদুর রব বাদী হয়ে শাওন, মানিক ও ফরহাদ সর্ব পিতা মতিন ভেন্ডারকে বিবাদী করে চাঁদপুর আদালতে একটি মামলা দায়ের করে।

মামলার কথা শুনে শাওন গংরা পরিকল্পনা আঁটতে থাকে কীভাবে আজিমকে ফাঁসানো যায়। ঘটনার চার দিন পর তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জানায় আজিমের ছোট ভাই আরাফাত মানিকের স্ত্রী জান্নাত আক্তারের মাথা পাঠিয়ে দেয়। বিষয়টি স্থানীয় ইউপি মেম্বার ও স্থানীয়রা নিশ্চিত করে। জানা যায় ৩০ জুন জান্নাত আক্তার এর স্বামী মানিক এ বিষয়ে ফরিদগঞ্জ থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করে।

কয়েকদিন পর আজিম জানতে পারেন তার নামে শাওন ও মানিক ফরিদগঞ্জ থানায় একটি অভিযোগ করেন। অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে ৩০ জুন সোমবার মানিকের স্ত্রী জান্নাত আক্তারকে(২২) আজিমের ছোটো ভাই আরাফাত মাথায় আঘাত করেছে। মূলত ঐ সময় আজিম মামলার কাজে চাঁদপুরে ছিলেন এবং আরাফাত ফরিদগঞ্জ পৌরসভার মিরপুরে ছিলেন। যা তাদের মোবাইল নেটওয়ার্ক রেকর্ড থেকে জানা যায় বলে যুক্তি তুলে দরছেন আজিম গং।

জান্নাত আক্তারের আহত হওয়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের সাথে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলেন শাওন, মানিক ও জান্নাত। এ বিষয়ে শাওন ও মানিক বলেন ৩০ জুন জান্নাত আক্তার চাঁদপুর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়িতে চলে আসেন। জান্নাত একই বিষয়ে বলেন তিনি চাঁদপুর সদর হাসপাতালে ২ দিন ভর্তি ছিলেন। অপরদিকে সাংবাদিকদের ভুল তথ্য দিয়ে আজিমের বিরুদ্ধে একটি সাজানো রিপোর্ট করে, সেখানে উল্লেখ করা হয় জান্নাত আক্তারকে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সএ ভর্তি করানো হয়।

বিষয়টি যে সাজানো তা অনেকটাই পরিস্কার। তবে জান্নাত আক্তারের মাথায় আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট, এমনকি তার সেলাইও করা হয়েছে। তবে সাংবাদিককে উপস্থিত কোনো প্রমানাদি তারা দেখাতে পারেননি। এমনকি তাদের কাছে মেডিকেল ডকুমেন্টের জন্য একাধিকবার ফোনকল ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করেও আদায় করা সম্ভব হয়নি। ভুক্তভোগী এবং এলাকাবাসী মানিকদের উক্ত অভিযোগ পরিকল্পত ও হয়রানিমূলক বলে মনে করছেন। তারা এও বলছে বিষয়টি ‘নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রা ভঙ্গে’র মতো হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মানিকের স্ত্রী জান্নাত আক্তার জানান, ‘আমার ভাসুর শাওন ইটের গাড়ি নিয়ে আসার সময় আজিম কাকা বাধা দেয়। পরে আমি সকাল ৯ টায় ওখানে যাই। তবে ঐ দিন কিবার ও কত তারিখ আমার খেয়াল নেই। ওরা আমার ভাসুরের কাছে গাড়ি আটকিয়ে চাঁদা চেয়েছে। এটা নিয়ে তাদের মধ্যে চিল্লাপাল্লা হয়। আমার স্বামীকে আজিমের ছোটো ভাই আরাফাত লাঠি দিয়ে আঘাত করেছে। আমার স্বামী সদর হসপিটাল চাঁদপুরে চিকিৎসাও নিয়েছে। তাকে ঐ দিন দুপুর ১২ টায় সদর হসপিটালে নেয়া হয়। দুপুর ২ টায় আমার স্বামীর ওপর হামলা হলে আমি তাকে উদ্ধার করতে গেলে পেছন থেকে চাপাতি দিয়ে আরাফাত আমাকে কোপ দেয়। আমাকে ৩ টায় চাঁদপুর সদর হসপিটালে নিয়ে যায়। দুই দিন আমি হসপিটালে ভর্তি ছিলাম।’

মানিক মুঠো ফোনে বলেন, ‘২.৩০ মিনিটে আমার ওয়াইফ হামলার শিকার হয়। বিকাল ৩ টায় তাকে চাঁদপুর সদর হসপিটালে নেয়া হয়। হসপিটালে ডাক্তার ভর্তি রাখতে চেয়েছে আমরা রাখি নাই। তাকে বাড়িতে নিয়ে আসি।’

শাওন বলেন-‘আজিমের সাথে আমাদের কোনো পূর্ব শত্রুতা নেই। এটা কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটা সম্পূর্ণ আমাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক। ২৬/০৬/২৫ইং তারিখে আমার ভাই প্রতিদিনের মত দুপুরে খাবার খেতে আসলে তারা তিনজন আজিম, আরাফাত ও আব্দুর রবসহ বহিরাগত অনেকেই হামলা করে। আর আমরা মাদকের সাথে জড়িত কেউ প্রমাণ দিতে পারবে না।’

এ বিষয়ে আজিম জানান, আমার ওপর হামলা করেছে শাওন, মানিক ও ফরহাদ। তারা তিন ভাই পূর্বে গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্ত ছিলো। তাদের এসব কর্মকান্ডের জন্য আমি বাধা হয়ে দাঁড়াতাম।

তবে ২৬ জুন বৃহস্পতিবার তারা ইটের গাড়ি নিয়ে আসার সময় তাদেরকে বললাম এই রাস্তাটি যেহেতু আমরা সবাই ব্যবহার করি, রাস্তা নষ্ট হলে সবারই চলাচলে কষ্ট হবে। আমরা সবাই মিলে কিছু টাকা তুলে যদি রাস্তা সংস্কার করি তাহলে সবারই সুবিধা হবে। হ্যাঁ, আমি এটা বলেছি যদি রাস্তা সংস্কারে টাকা না দেন তাহলে বর্ষাকালে রাস্তা ব্যবহার করে নষ্ট করছেন কেন? এটা করতে পারবেন না।

মূলত আমি কেন টাকা চেয়েছি সে জন্য তারা আমাকে যথেষ্ট মেরেছে। তারা আমার চেয়ে দীর্ঘদেহী এবং পেশীবহুল। আমি তাদের তুলনায় অনেক দুর্বল। তাই আমি অনেক মাইর খেয়েছি। তারা এতোই মেরেছে যে আমাকে হসপিটালে ভর্তি হতে হয়েছে। ঘটনার চারদিন পর জানতে পারি মানিকের স্ত্রীকে আমার ছোট ভাই মেরেছে। যা সম্পূর্ণ্য মিথ্যা কথা। সেই সাথে বানোয়াট এবং উদ্দেশ্যে প্রনোদিত। ৩০ তারিখ আমরা ঘটনাস্থলে ছিলামই না। আমি ছিলাম চাঁদপুরে। আমার ছোট ভাই ছিলো মিরপুরে। আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া কারণ ঘটনাকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করা।’

আজিমের ছোটো ভাই আরাফাত বলেন, আমি ৩০ তারিখ সোমবার সকাল ১০টা থেকে খালাম্মার বাসায় অবস্থান করি। সন্ধ্যায় আমি ও আমার ভাই আজিম বাসায় আসি। যেহেতু আমি ঐদিন বাড়িতেই ছিলাম না, হামলার প্রশ্নই উঠে না। আমাকে উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে জড়ানো হয়েছে।’

উক্ত ঘটনার একজন প্রত্যক্ষদর্শী সিরাজ জানান,‘শাওন ও মানিক এরা গাঁজা সেবন করে। এগুলোর জন্য কেউ বাধা দিলে তারা তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়। আজিম প্রায় সময় বাধা দিত। এ দিন আজিমের ওপর হামলা হয়। আমি পাশে ছিলাম, আমাকেও তারা গালি গালাজ করে মারতে তেড়ে আসে। এরা পূর্ব হতেই বেপরোয়া।’ মাইজ বাড়ির সামনে অবস্থিত চায়ের দোকানদার আব্দুর রহিম জানান, ‘আজিমকে আগে থেকেই নিরব ভদ্র ছেলে হিসেবে আমরা জানি। শাওন ও মানিক এরা নেশাগ্রস্ত বেপরোয়া টাইপের।’

একই বাড়ির আব্দুল মান্নান (৬৫) (মানিক ও শাওনের অভিযোগের স্বাক্ষী) জানান, আমি ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলাম না। ঐ মুহুর্তে আমি জমিতে কাজ করি।

একই বাড়ির কিশোর জাহিদ বলে, আমার মা (বিলকিছ) মিথ্যা স্বাক্ষী হয় নাই বিধায় শাওন- মানিক আমার মাকে হুমকি ধমকি দিয়েছে।

ইজিবাইক চালক শামছু, পিতা দুলাল মিয়া বলেন, ঘটনার দিন আমাকে মানিক ডেকে আমার গাড়িতে উঠে। তার সাথে তার স্ত্রী ও নুরা নামের একজন ছিলো। আমি তাদেরকে এলাকা থেকে (ঘোড়াশাল) নিয়ে রূপসা বাজারে নামিয়ে দিয়েছি। আমি তার স্ত্রীকে সুস্থ দেখেছি।

এলাকাবাসীর অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায়, আজিমকে হয়রানি করার জন্য এ মামলা করা হয়েছে। আমরা ঘটনা জানার পর মর্মাহত হয়েছি। মহিলার ওপর হামলার বিষয়ে আমরা কেউই অবগত নই। মহিলার ওপর হামলা হয়েছে এ বিষয়টি আমাদের নজরে আসে নাই। তবে উক্ত ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে আজিমকে ফাঁসানোর জন্য করা হয়েছে। শাওন ও মানিক আওয়ামীলীগের আমলে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে পারতো না। আওয়ামীলীগের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে তারা এলাকায় মাদকের সয়লাব করে ফেলছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো.আনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন,‘বিষয়টি আমি ঐদিনই আজিমের কাছে শুনেছি। আমি তাকে বলেছি আগে চিকিৎসা নিতে। তার ঠিক চার দিন পর জানি মানিকের স্ত্রী আহত হয়েছে।
রূপসা উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি। এক পক্ষ আদালতে মামলা করেছে, আরেকপক্ষ থানায় অভিযোগ করেছে। তবে এলাকাতে শাওনের রিপোর্ট ভালো না, এটা বলতে পারি।

ফরিদগঞ্জ থানার এস.আই রাকিবুল সাংবাদিকদের বলেন- এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোর্টে মামলা হয়েছে এটা আমি জানতাম না। তবে থানায় একটি অভিযোগ হয়েছে। অভিযোগের আলোকে তদন্ত চলমান রয়েছে।
ফরিদগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ বলেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ভালো বলতে পারবেন।

সম্পর্কিত খবর